• পণ, অবসাদ, গাঁজা, গর্ভপাত— ত্বিষা কাণ্ডে দুই পক্ষে তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি! কোথায় লুকিয়ে সমর্থ?
    এই সময় | ২০ মে ২০২৬
  • মধ্যপ্রদেশের ভোপালের কাতারা হিলস এলাকায় ৩৩ বছর বয়সি গৃহবধূ ত্বিষা শর্মার রহস্যমৃত্যুকে ঘিরে তোলপাড় গোটা দেশ। এরই মধ্যে তাঁর বাপের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির বিবাদ চরম রূপ নিল। গত ১২ মে তরুণীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হওয়ার পরে প্রাথমিক তদন্তে একে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। তবে বর্তমানে এই মামলা এক জটিল আইনি লড়াই ও কাদা-ছোড়াছুড়ির রূপ নিয়েছে। মৃতার শাশুড়ি তথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিং সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁর পুত্রবধূকে ‘মানসিক রোগী ও মাদকাসক্ত’ বলে দাবি করার পরে, পাল্টা তাঁর ছেলের নিখোঁজ হওয়া এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করল তরুণীর পরিবার।

    ত্বিষার মৃত্যুর পরে সোমবার ও মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মৃতার শাশুড়ি গিরিবালা সিং দাবি করেছেন, বিয়ের পর থেকেই ত্বিষার আচার-আচরণে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ্য করেছিলেন তিনি। ‘ড্রাগ উইথড্রল সিম্পটম’ দেখা দিয়েছিল। তাঁর আরও দাবি ত্বিষা স্কিৎজ়োফ্রেনিয়ার রোগী ছিলেন। মানসিক রোগের জন্য ওষুধও খেতেন।

    গর্ভস্থ সন্তানকে না রাখার জেদ থেকে ত্বিষা নাকি অতিরিক্ত মাত্রায় গাঁজাও সেবন করা শুরু করেছিলেন বলে দাবি করেছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিং। তিনি বলেছেন,

    ‘গত ১৭ এপ্রিল অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই ত্বিষা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিল এবং গর্ভপাত করাবে বলে জেদ ধরেছিল। ও তীব্র স্কিৎজ়োফ্রেনিয়ায় ভুগছিল এবং হাত কাঁপার মতো উইথড্রয়াল সিম্পটম ছিল। এমনকী ও ডাক্তারের সামনেই স্বীকার করেছিল যে ও প্রচুর গাঁজা খেত। গন্ধ লুকোতে ঘরে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখত।’

    গিরিবালার অভিযোগ, এপ্রিলের ৩০ তারিখেও ত্বিষা গর্ভপাতের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার জেদ ধরেছিলেন এবং মানসিক অবসাদ থেকেই গত ১২ মে সকালে ছাদে গিয়ে আত্মঘাতী হন।

    গল্পের অন্য পিঠটা কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টো এবং ভয়ঙ্কর। নয়ডা থেকে ছুটে আসা কান্নায় ভেঙে পড়া ত্বিষার বাবা-মায়ের দাবি, তাঁদের মেয়েকে ‘খুন’ করা হয়েছে।

    তাঁদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মেয়েকে স্বাধীন কেরিয়ার গড়তে বাধা দেওয়া হচ্ছিল। চার দেওয়ালে বন্দি করে তাঁর উপরে চালানো হতো মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। ত্বিষার বাবার নবনিধি শর্মার প্রশ্ন,

    ‘যে মেয়ে আজ আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বেঁচে নেই, তাকে মাদকাসক্ত বা মানসিক রোগী সাজিয়ে দেওয়া খুব সহজ! ওর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন কীসের? নিজেদের বাঁচাতে এবং অপরাধ ঢাকতেই এই মনগড়া গল্প ফাঁদছেন একজন প্রাক্তন বিচারক।’

    ত্বিষার ভাই, ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর হর্ষিত শর্মার দাবি, তাঁর দিদিকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে খুন করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ, ৯ মে ত্বিষা তাঁর মাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, ‘মা, প্লিজ কাল এসে আমায় নিয়ে যাও, এখানে জীবন নরক হয়ে গিয়েছে।’ CCTV ফুটেজের সূত্র ধরে মেজর হর্ষিত শর্মা প্রশ্ন তুলেছেন,

    ‘ঘটনার পরে শাশুড়ি গিরিবালা সিংকে অত্যন্ত শান্ত ভাবে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে দেখা গিয়েছে, একজন মুমূর্ষুকে বাঁচানোর জন্য তাড়াহুড়ো করতে দেখা যায়নি। বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের দূরত্বে থানা হওয়া সত্ত্বেও তারা পুলিশকে জানায়নি, প্রথম ফোন আমরাই করি।’

    ত্বিষার বাপের বাড়ির আরও অভিযোগ, ১৫ মে গভীর রাতে FIR দায়ের করা হয়। কিন্তু তার আগেই প্রভাব খাটিয়ে আগাম জামিনের ব্যবস্থা করে নেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক শাশুড়ি। আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

    তাঁদের দাবি, বয়স এবং সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে গিরিবালা সিং-কে আদালত আগাম জামিন দিলেও, তিনি নাকি জামিন পাওয়ার পরে আদালত চত্বরেই ৬১ বছরের নবনিধি শর্মাকে গুন্ডা দিয়ে হুমকি দিয়েছেন। মামলা না তুললে বা বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁদের মারধর করা হবে বলে শাসানি দিয়েছে সেই গুন্ডারা।

    ঘটনার পর থেকেই মূল অভিযুক্ত তথা ত্বিষার স্বামী সমর্থ সিংয়ের গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছে ত্বিষার বাপের বাড়ির লোকজন। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ‘লুকআউট নোটিস’ জারি করেছে এবং মধ্যপ্রদেশের ভিতরে ও বাইরে বিভিন্ন দল পাঠিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। তবে গিরিবালা সিংয়ের দাবি, পুরুষের শোক প্রকাশের ভাষা আলাদা, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতেই তিনি আপাতত আড়ালে আছেন।

    সূত্রের খবর, CCTV ফুটেজে ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পরে সমর্থকে তাঁদের এক প্রতিবেশী এবং এক পরিচারকের সঙ্গে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে ত্বিষাকে CPR দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছে। পুলিশ এখন ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণের উপরে ভিত্তি করে খুনের তত্ত্ব খতিয়ে দেখছে।

  • Link to this news (এই সময়)