একসঙ্গে ১৭টি ঠিকানায় নোটিস দিল কলকাতা পুরসভা। বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ওই নোটিসগুলি যে যে ঠিকানায় দেওয়া হয়েছে, তার কোনওটি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কোনওটি তাঁর বাবা-মা, আবার কোনওটি ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার মালিকানাধীন। ওই ১৭টি ঠিকানার অনেকগুলিই রয়েছে কালীঘাট অঞ্চলে। রয়েছে হরিশ মুখার্জি রোড, কালীঘাট রোড–সহ একাধিক ঠিকানা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়ে যে কলকাতা পুরসভা তথ্য তলব করেছে, সে কথা আগেই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতা পুর আইনের ৪০০ (১) ধারা অনুযায়ী ওই নোটিসগুলিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাড়িতে বেআইনি নির্মাণ রয়েছে। সেই বেআইনি নির্মাণের অংশটি বাড়ির মালিককে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে ফেলতে হবে। সেটা না করলে, তার বদলে নোটিস পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে কলকাতা পুরসভার কাছে বিষয়টি নিয়ে কারণ দর্শাতে হবে। এই নির্দেশ না–মানলে পুরসভার কমিশনার অন্তত সাতদিন সময় দিয়ে ওই নির্মাণের বেআইনি অংশ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেবেন। তার সঙ্গেই নোটিসে জানানো হয়েছে, সে ভাবে বেআইনি নির্মাণ ভাঙলে যে খরচ হবে, তা বাড়ির মালিক বা আবাসিকের কাছ থেকে আদায় করা হবে। পুরসভা সূত্রের খবর, এই বাড়িগুলির ‘অ্যাজ় বিল্ট ড্রয়িং’ (বিস্তারিত নকশা), অর্থাৎ, বাড়ির কোথায় লিফট, এসকালেটর, সিঁড়ি ইত্যাদি কোথায় আছে এবং এই বাড়ির কোন তল কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে, এই নথি সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, যে সব ঠিকানায় নোটিস পাঠানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোড, পণ্ডিতিয়া রোড, কালীঘাট রোড, প্রেমেন্দ্র মিত্র সরণি এবং ওস্তাদ আমির খান সরণি। এই বাড়িগুলি কবে তৈরি এবং কবে পুর আইন ভেঙে করে সেখানে বেআইনি নির্মাণ করা হয়েছে, তা অবশ্য নোটিসে স্পষ্ট নয়। পুরসভা সূত্রের খবর, এই ১৭টি বাড়ির তালিকায় হরিশ মুখার্জি রোডের ‘শান্তিনিকেতন’ বহুতলটিও রয়েছে। এ ছাড়া অভিষেকের বাবা অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়, মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ নামে বেসরকারি সংস্থাটির মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি সম্পত্তি রয়েছে।
‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থাটির নাম এর আগে বার বার উঠে এসেছে শিক্ষা-নিয়োগ দুর্নীতি মামলায়। এই সংস্থার সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও ওঠে। এই আবহে বাড়ির বেআইনি নির্মাণ ভাঙার নোটিস পাঠানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।
এই নোটিস পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য না–করলেও এ দিন কালীঘাটে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের বৈঠকে প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন অভিষেক নিজেই। সূত্রের খবর, এ দিন বৈঠক চলাকালীন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘ওদের যা ইচ্ছে হয় করুক। আমার বাড়ি ভাঙুক, নোটিস পাঠাক, যা মনে হয় করতে পারে। আমি এ সবের সামনে মাথা নত করব না। যাই হয়ে যাক, বিজেপির বিরুদ্ধে আমার লড়াই জারি থাকবে।’ তৃণমূলের এক বিধায়ক বলেন, ‘এ দিনের বৈঠকে অভিষেক এও বলেছেন যে, তাঁর নামে যতগুলি ঠিকানা দেখানো হচ্ছে, সেই সবক’টি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তিনি নন।’ তবে জোড়াফুলের তরফে এ নিয়ে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের দাবি, এই নোটিস পাঠানোর বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর কথায়, ‘এই বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। বিষয়টি আমার আওতায় নয়।’ তৃণমূল সূত্রের খবর, এ দিন কালীঘাটের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্নের মুখেও পড়েন ফিরহাদ। তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘ববি বলছে ওর নজরের বাইরে ছিল। কিন্তু ওর বিষয়টা জানা উচিত ছিল।’ যতদিন পুরবোর্ড থাকবে, তত দিন মেয়র, কাউন্সিলার-সহ সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মমতা।
সূত্রের দাবি, পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডের নির্দেশে বিল্ডিং বিভাগের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা এক একটি ঠিকানায় এই নোটিসগুলি পাঠিয়েছেন। যদিও পুর কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বেজে গিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো মেসেজেরও জবাব মেলেনি। বিভিন্ন ঠিকানায় বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত নোটিস পাঠানো নিয়ে এ দিন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল দিল্লিতে বলেছেন, ‘তৃণমূলের চার–পাঁচজন নেতা ও গুন্ডাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা নোটিস পাঠাচ্ছি।’ তৃণমূলের লোকসভার দলনেতাকে খোঁচা দিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘গাড়ির বনেটের উপরে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বলতেন! আপনি নিজে বেআইনি কাজ করেছেন। লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের সঙ্গে কোনও যোগ নেই বলতেন! আপনি তো আইনের ঊর্ধ্বে নন। (বলা হয়েছে) প্ল্যান আনুন। না হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’