• ত্বিষা, দীপিকা… প্রতিদিন গড়ে ১৬ জনের মৃত্যু! যৌতুক আজও দগদগে ঘা, NCRB-র রিপোর্টে বিস্ফোরক তথ্য
    এই সময় | ২০ মে ২০২৬
  • দেশের আইনের শাসন রয়েছে। সমাজ আজ আধুনিক মনস্ক। এই সমস্ত বড় বড় দাবির মুখে কালি মাখিয়ে ভারতে এখনও অবিরাম ঘটে চলেছে পণ বা যৌতুকের দাবিতে বধুহত্যা। সম্প্রতি ভোপালে ত্বিষা শর্মার মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই অভিযোগ উঠেছে। তার আগে গ্রেটার নয়ডায় দীপিকা নাগরের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ উঠেছে। বস্তুত সাম্প্রতিক সময়ে এই রকম বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে। এগুলি শিরোনামে উঠে এসেছে। কিন্তু আরও এই অপরাধের ব্যপ্তিটা ধরা পড়েছে ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো বা NCRB-র পরিসংখ্যানে। দেশের সমাজব্যবস্থার এ এক অত্যন্ত অন্ধকার ও লজ্জাজনক চিত্র।

    চলতি বছরের ৬ মে ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া ২০২৪’ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে NCRB। এই বার্ষিক খতিয়ান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে পণের দাবিতে নির্যাতনে মোট ৫,৭৩৭ মহিলার মৃত্যু হয়েছিল। অন্তত এই মামলাগুলি নথিভুক্ত হয়েছিল। এর সহজ এবং নির্মম অর্থ হলো—আজকের দিনে দাঁড়িয়েও এই দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ জন মহিলা পণের দাবিতে হওয়া অত্যাচারের বলি হচ্ছেন।

    মেট্রোপলিটন শহরগুলির ক্ষেত্রে এই তালিকায় টানা পঞ্চম বছরের জন্য শীর্ষস্থানে রয়েছে দেশের রাজধানী দিল্লি। ২০২৪ সালে দিল্লিতে পণের দাবিতে নির্যাতনের মৃত্যুর ১০৯টি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছিল। এতে মোট ১১১ জন মহিলার মৃত্যু হয়েছিল। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কানপুর (৫৪টি মামলা) এবং তৃতীয় স্থানে বেঙ্গালুরু (২৫টি মামলা)।

    পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় পণের দাবিতে হওয়া অত্যাচারে মৃত্যুর হার প্রতি ১ লক্ষে ১.৪। এর বিপরীতে চেন্নাই বা কোচির মতো দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু বড় শহরে ২০২৪ সালে পণ-নির্যাতনে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল শূন্য।

    ১৯৬১ সালে লাগু হয়েছিল পণ নিষিদ্ধকরণ আইন বা Dowry Prohibition Act। IPC-তে ছিল ৩০4B ধারা, বর্তমানে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’য় ৮০ নম্বর ধারা হিসেবে কার্যকর হয়েছে। সেই আইন অনুসারে— বিয়ের সাত বছরের মধ্যে কোনও মহিলার অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে এবং মৃত্যুর ঠিক আগে পণের দাবিতে অত্যাচারের প্রমাণ মিললে তা সরাসরি পণের দাবিতে অত্যাচারে মৃত্যু হিসেবে গণ্য হয়।

    ২০২৩ সালে এসেও এই আইনের আওতায় সারা দেশে মামলা দায়ের হয়েছিল ১৫,০০০-এর বেশি (১৫,৪৮৯টি)। তার আগের বছরের তুলনায় মামলার সংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। রাজ্যভিত্তিক তালিকায় শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ (৭,১৫১টি মামলা)। দ্বিতীয় স্থানে বিহার (৩,৬৬৫টি মামলা) এবং তৃতীয় স্থানে কর্নাটক (২,৩২২টি মামলা)।

    সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা গোটা সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। যেমন, নয়ডার বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সি ত্বিষা শর্মা। বিয়ের মাত্র ৫ মাসের মাথায় গত ১২ মে ভোপালের কাতারা হিলসে তাঁর রহস্যমৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে মায়ের ফোনে তাঁর পাঠানো শেষ বার্তা— ‘আমার ভীষণ দম আটকে আসছে মা’ — সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে।

    এ ছাড়া গ্রেটার নয়ডার ২৪ বছরের দীপিকা নাগর। তাঁর পরিবার তাঁর বিয়েতে প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ করার পরেও অতিরিক্ত পণের দাবিতে তাঁকে ছাদ থেকে ফেলে খুনের অভিযোগ উঠেছে।

    এমনকী ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক মহিলা সোয়াট (SWAT) কম্যান্ডোকে পর্যন্ত তাঁর স্বামী পণের দাবিতে খুন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিশ্লেষকরা বলছিলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশের উচ্চপদে থাকা বা সুরক্ষাকর্মীরাও এই সামাজিক ব্যাধির হাত থেকে মুক্ত নন।

    আসলে সমাজতত্ত্ববিদদের মতে সামাজিক ব্যাধি শুধুমাত্র কঠোর আইন দিয়ে সারানো সম্ভব নয়। পণের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করতে প্রয়োজন সামগ্রিক ভাবে মানসিকতার পরিবর্তন। ত্বিষা-দীপিকাদের এই মর্মান্তিক পরিণতি এবং NCRB-র এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, কেবল আইনি রক্ষাকবচ নয়, মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার সুনিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সমাজকে আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে হবে।

  • Link to this news (এই সময়)