মণিপুষ্পক সেনগুপ্ত
মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই তিনি বলেছিলেন, ‘চরৈবেতি, চরৈবেতি, চরৈবেতি।’ যার অর্থ, এগিয়ে চলা। মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রথম দশদিনে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করে শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়ে দিয়েছেন ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রেই চলবে তাঁর সরকার।
মঙ্গলবার ঠা–ঠা রোদে হুডখোলা জিপে চেপে ফলতার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আরও একটি বার্তা স্পষ্ট করেছেন শুভেন্দু অধিকারী—রাজ্য প্রশাসনের দায়িত্ব কাঁধে থাকলেও রাজনীতির মাঠে তিনি গা–ছাড়া দেবেন না। সেখানেও একই মন্ত্র তাঁর—‘চরৈবেতি।’
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আগামী ২১ মে ফলতায় পুর্ননির্বাচন। দুই–তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সদ্য ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ফলতার ফলাফল যাই হোক, তার কোনও প্রভাব নতুন সরকারের উপর পড়বে না। ওই কেন্দ্রে বিজেপি কোনও ভাবে হেরে গেলেও শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের ভিত একইরকম মজবুত থাকবে।
কিন্তু রাজনীতির পরিসরে মেদ জমতে দিতে চান না শুভেন্দু। বিধানসভা ভোটের আগে যতটা তৎপরতার সঙ্গে তিনি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন, ঠিক একই জোশে মঙ্গলবার ফলতায় শেষ দিনের নির্বাচনী প্রচার সারলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। হাঁসফাঁস গরমে এ দিন দুপুরে হুডখোলা গাড়িতে চেপে দলীয় প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডার সমর্থনে বনেশ্বরপুর থেকে ফলতা বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রোড শো করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে স্থানীয় এক শিবমন্দিরে পুজোও দেন তিনি। রোড শো চলাকালীন তাঁকে দেখার জন্য রাস্তার দু’ধারে উপচে পড়েছিল সাধারণ মানুষের ভিড়। কার্যত পুষ্পবৃষ্টিতে নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে ফলতায় স্বাগত জানানো হয়। শুভেন্দুও কাউকে নিরাশ করেননি। গাড়ি থেকে তিনি কখনও ফুল ছোড়েন রাস্তার দু’ধারের সাধারণ মানুষের দিকে, কখনও তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান। রোড শো শেষে ফলতার নিহত বিজেপি কর্মী স্বপন মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ছবিতে মালা দেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০২১–এ ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের আবহে স্বপনকে খুন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনই শুধু নয়, দিন চারেক আগে ফলতায় এসে নির্বাচনী জনসভাও করে গিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেখান থেকে এক লাখেরও বেশি ভোটের মার্জিনে বিজেপি প্রার্থীকে জেতানোর ডাক দিয়েছিলেন তিনি। এ দিন শুভেন্দুর রোড শো চলাকালীনই ওই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু তার পরেও প্রচার কর্মসূচিতে কোনও কাঁটছাট করেননি মুখ্যমন্ত্রী। বরং রোড শো থেকে দলীয় কর্মী সমর্থকদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘এটা তৃণমূলের কৌশল। যাতে আপনারা ভাবেন, জিতে তো গিয়েছি, ভোট না দিলেও চলবে। দশ বছর পরে ভোট দেওয়ার সু়যোগ পেয়েছেন। একশো শতাংশ ভোট চাই। ফলতায় যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে বা রুজি রোজগার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের জন্য বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
শুভেন্দু বিলক্ষণ জানেন, ২০৭ আসনে জেতার পরে মাত্র একটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট নিয়ে ফলতার স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের মধ্যে কিছুটা হলেও গা–ছাড়া মনোভাব তৈরি হবে। তাই এ দিন ভোট প্রচারে বেরিয়ে বেশ কয়েক বার দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আত্মতুষ্টিতে ভুগবেন না। ফলতায় আমাদের এক লাখেরও বেশি ভোটে জিততে হবে।’
২০২৪–এর লোকসভা ভোটে এই ফলতা বিধানসভা থেকে দেড় লাখেরও বেশি ভোটে লিড পেয়েছিলেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে এই কেন্দ্রের তাৎপর্যও যে বিজেপির কাছে রাজ্যের অন্যান্য আসনের থেকে আলাদা তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ দিন ফলতায় হাজির হয়েছিলেন স্থানীয় পদ্ম নেতা–কর্মীদের শুভেন্দুদা হিসেবে। সেখানে তিনি আশ্বাস দেন, ‘ফল ঘোষণার দিন আবার ফলতায় আসব আমি। গণনাকেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী জয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে বেরনোর পরে তাঁকে প্রথম মালাটা আমি–ই পরাব।’ যা শুনে সমবেত আওয়াজ ওঠে, ‘শুভেন্দুদা চরৈবেতি, চরৈবেতি, চরৈবেতি।’