আরও অন্যভাবে বললে ইস্টবেঙ্গল আর আইএসএল ট্রফির মাঝে দাঁড়িয়ে এক বঙ্গসন্তান—অভিজিৎ মণ্ডল।
ইন্টার কাশীর রিমোট কন্ট্রোল এখন তাঁরই হাতে। লাল-হলুদের বারের নীচে একসময়ে তিনি ছিলেন এক প্রাচীর।
তাঁর ওই গ্লাভস জোড়ায় জমে রয়েছে বহু রাতের গল্প।
ইস্টবেঙ্গলে বালুরঘাটের ছেলেটার সই করা কম চমকপ্রদ ছিল না। নাটকীয়তায় মোড়া ছিল তা।
তখন অভিজিৎ ছিলেন ইউনাইটেড স্পোর্টসের গোলকিপার। কলকাতা লিগের শেষ ম্যাচে একদিকে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান স্পোর্টিংয়ের মহারণ, অন্যদিকে শিলিগুড়িতে মোহনবাগান-ইউনাইটেড স্পোর্টসের লড়াই। দুই মাঠজুড়ে তখন দুই ভিন্ন গল্প লেখা হচ্ছিল একই সময়ে।
ইস্টবেঙ্গল সেদিন মহমেডান স্পোর্টিংকে পাঁচ গোলে বিধ্বস্ত করে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
একই সময়ে শিলিগুড়িতে ইউনাইটেড স্পোর্টসও মোহনবাগানকে হারিয়ে দেয়। যুবভারতীর নীল আকাশে উড়ছিল লাল-হলুদ আবির। প্রিয় ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় উচ্ছ্বসিত ছিলেন লেসলি ক্লডিয়াস সরণীর ক্লাবের সমর্থকরা।
কিন্তু শিরোপা জয়ের সেই আনন্দের মাঝেই আচমকা বদলে যায় দৃশ্যপট। লিগ জয়ের পরপরই ইস্তফা দিয়ে বসেন ইস্টবেঙ্গলের তৎকালীন কোচ ট্রেভর জেমস মর্গ্যান।
শোনা যায়, সেই সময় অভিজিৎ মণ্ডলকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন লাল-হলুদ কর্তারা এবং একই সঙ্গে আশিয়ান জয়ী গোলরক্ষক সন্দীপ নন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার নীল নকশা ছকা হয়ে গিয়েছিল। ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের এহেন সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে মর্গ্যান কোচের দায়িত্ব ছাড়েন।
এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায়। মর্গ্যানকেও ফিরিয়ে আনা হয় লাল-হলুদে। ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে সন্দীপ নন্দী চলে যান চার্চিল ব্রাদার্সে। আর মর্গ্যানের দলের শেষপ্রহরীর কাজ করে যান অভিজিৎ।
প্রথম বছরেই ইস্টবেঙ্গলের হয়ে শিলিগুড়িতে ফেডারেশন কাপ জেতার স্বাদ পান তিনি। ডেম্পোর হয়ে পাঁচবারের ভারতসেরা গোলকিপার এই বঙ্গসন্তান।
ইন্টার কাশী থেকে আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের বিদায়ের পর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দুই ম্যাচে অভিজিৎ লিখেছেন নীরব এক প্রতিরোধের আখ্যান।
দিল্লির বিরুদ্ধে ড্র, আর সবুজ-মেরুন ব্রিগেডকে থামিয়ে দেওয়ার পরে এবার সামনে ইস্টবেঙ্গল। কামিন্স-পেত্রাতোসদের স্তিমিত করার পর লাল-হলুদ গ্যালারি কথা বলতে শুরু করে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা পোস্ট করতে শুরু করেন অভিজিতের খেলোয়াড়জীবনের ছবি।
ডার্বি ড্রয়ের পরে ইস্টবেঙ্গলের সাজঘরে আরও বেশি করে ঢুকে পড়েছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গন্ধ। সোনালী স্বপ্ন আরও কাছে।
কিন্তু অভিজিতকে যাঁরা চেনেন, জানেন, তাঁরা মনে করেন এই ছেলেটা বিনা যুদ্ধে একটুও জমি ছাড়বেন না। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ম্যাচটা যুবভারতীতে হলে একইসঙ্গে স্বস্তি এবং আরও খুশি হতেন প্রাক্তন গোলকিপার।
কারণ বিশালাকায় যুবভারতী তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। গ্যালারির প্রতিটি সিট, ঘাসের ঘ্রাণ তাঁর খুব পরিচিত।
যুবভারতীর গ্যালারির নীচে যুব আবাসে তিনি কাটিয়েছেন আট-আটটা বছর। সেই কারণে যুবভারতী হয়ে ওঠে তাঁর যৌবনের উপবন। খেলোয়াড়জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি ইস্ট-মোহনের আক্রমণ শুষে নিয়েছিলেন। বেশিরভাগ সময়ে তিনি ছিলেন ডেম্পোর শেষপ্রহরী।
তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে গোয়া। ডেম্পোর বার আগলানোর সময়ে গোলের পিছন থেকে তাঁর উদ্দেশে উড়ে এসেছে টীকা-টীপ্পনী। তিনি স্রেফ পাত্তাই দেননি। ধর্ণুভাঙা পণ করতেন, ''কিছুতেই গোল খাব না।''
আইএসএলে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে বহু যুদ্ধের সৈনিক অভিজিৎ দেখেছিলেন, ফোটোগ্রাফাররা সবাই চলে গিয়েছেন তাঁদের গোলের পিছনে। মোহনবাগানের গোলের ফ্রেম চাই সবার। কিন্তু খেলোয়াড়জীবনের অভিজ্ঞতা অভিজিৎ ছড়িয়ে দেন তাঁর ছেলেদের রক্তে। সেদিন ভাগ্যদেবী সহায় হলে ইন্টার কাশীই হয়তো শেষ হাসি হাসত।
তাঁর ঠাকুরঘরে রয়েছে ডেম্পোর প্রয়াত তারকা জুনিয়রের ছবি। অতীতে মরশুম শুরু হওয়ার আগে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে পুজো দিতে যেতেন অভিজিৎ। কালীভক্ত প্রাক্তন গোলকিপার যে ইস্টবেঙ্গল-ম্যাচের হোমওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।
গোলকিপাররা মাঠের প্রতিটি কোণ গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করেন। খেলার সামগ্রিক চিত্র তাঁদের চোখের সামনে স্পষ্ট থাকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রাক্তন গোলকিপার অভিজিৎ অন্যদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি যেমন বিস্তৃত, তেমনি খেলাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও অনন্য।
বৃহস্পতিবার কিশোর ভারতীতে জ্বলবে আলো। তা পুরনো স্মৃতি-পুরনো সম্পর্কের আর আবেগের। একদিকে ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাস ছোঁয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাক্তন লাল-হলুদ সৈনিকের নীরব লড়াই।
অভিজিৎ মণ্ডল জানেন ফুটবলমাঠে আবেগের কোনও জায়গা নেই। সেখানে থাকে শুধু দায়িত্ব। কিন্তু ফুটবল তো শেষ পর্যন্ত শুধু কৌশল বা ফলাফলের খেলা নয়, স্মৃতি, সম্পর্ক আর ফিরে আসার গল্পও বলে যায় ফুটবল।
তাই বৃহস্পতিবারের ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল যদি ইতিহাস লেখে, কোথাও না কোথাও সেই গল্পের পাতায় অভিজিৎ মণ্ডলের নামও থেকে যাবে। আর যদি ইন্টার কাশী ইস্টবেঙ্গল-রথ থামিয়ে দেয়, তাহলেও কিশোর ভারতীর বাতাসে ভেসে উঠবে এক পুরনো নাম — অভিজিৎ মণ্ডল।