কলকাতার 'শান্তিনিকেতন', প্রাসাদপম বাড়ি ঘিরে যা কিছু চলছে
আজ তক | ২০ মে ২০২৬
কবি লিখেছিলেন, '...একদিন তুমি আমি শান্তিনিকেতন'। কিন্তু কলকাতার শান্তিনিকেতন ঘিরে রোম্যান্স নেই বিলকুল। রয়েছে ক্ষমতার দম্ভ। রাজ্য রাজনীতির একদা পাওয়ার হাউস। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে, ১৮৮A, হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িটি নিয়েই। তথাকথিত তৃণমূল কংগ্রেসের সেনাপতির বাড়ি। একদশকেরও বেশি সময় ধরে যে বাড়ি রহস্যে মোড়া।
সাধারণ মানুষের রাস্তা ছিল ব্যক্তিগত করিডোর
এই তো সে দিনও বাড়ির সামনে Z প্লাস ক্যাটেগরির নিরাপত্তায় মোড়া ছিল। দামি বিলাসবহুল গাড়ির কনভয় যখন বেরতো, পুলিশকর্তারা সারি দিয়ে স্যালুট মারতেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলে কথা! একরাতের মধ্যে খেলা ঘুরে গিয়েছে। ৪ মে-র পর থেকেই কলকাতার শান্তিনিকেতনের সামনে বিস্তর 'অশান্তি' চলছে। কখনও 'চোর চোর' স্লোগান, মিডিয়ার ভিড়, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। দক্ষিণ কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডের সেই অংশটা যেন একসময় সাধারণ রাস্তা ছিল না, ছিল এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। বহু বছর ধরে এলাকার বাসিন্দারা একই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, ভোর হওয়ার আগেই রাস্তা খালি করা, সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন, কনভয় যাওয়ার আগে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা গোটা এলাকা। সাধারণ মানুষের রাস্তা যেন পরিণত হয়েছিল এক ব্যক্তিগত করিডরে। অভিষেকের শান্তিনিকেতনের সামনে যে পুলিশ বুথ ছিল, সেটির লাগোয়া বাতিস্তম্ভে ঝুলছে বিজেপির পতাকা। বাড়ির সামনে লাইন দিয়ে যে চেয়ার পাতা থাকত, সে সবও তুলে দেওয়া হয়েছে ৪ মে-র পরেই।
১৮৮এ হরিশ মুখার্জি রোডের সেই বহুল আলোচিত বাড়ি, ‘শান্তিনিকেতন’। নামের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে বরাবরই চাপা কৌতুহল ছিল। কারণ এই বাড়িটিই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো, তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং দলের অন্যতম মুখ হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন সেই বাড়ির সামনে অন্য ছবি।
কেউ চেঁচাচ্ছেন, চোর চোর বলে, কেউ তুলছেন সেলফি
এখন সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কেউ স্লোগান দিচ্ছেন, 'চোর, চোর'। কেউ আবার মোবাইল ফোনে ভিডিও করছেন, সেলফি তুলছেন। যে রাস্তা দিয়ে একসময় সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও ভয় পেতেন, এখন সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে অনেকে খোলাখুলি ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, বহু বছর ধরে তাঁরা নিজেদের এলাকাতেই যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো ছিলেন।
শান্তিনিকেতন বিল্ডিং নিয়ে পুরসভার নোটিশ ও বুলডোজার
কলকাতা পুরসভা সূত্রে খবর, বর্তমানে অভিষেকের মোট ১৭টি সম্পত্তি তাঁদের স্ক্যানারে রয়েছে। তবে প্রাথমিক ভাবে ভবানীপুর বিধানসভা এলাকার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত ১২১, কালীঘাট রোড এবং ১৮৮এ, হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতেই ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরসভার নোটিশ। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই দুই ঠিকানার নির্মাণে মূল নকশার বাইরে গিয়ে ‘প্ল্যান-বহির্ভূত’ বেশ কিছু অংশ তৈরি করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে সেই বেআইনি অংশ ভেঙে ফেলতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিষেক নিজে উদ্যোগী হয়ে তা না ভাঙলে, পুরসভাই বুলডোজার দিয়ে সেই অংশ গুঁড়িয়ে দেবে।
কী বলছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?
তৃণমূল কংগ্রেস সূত্রের খবর, দলের বিধায়কদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ সাফ বলেন, 'ওরা যা খুশি করুক। আমার বাড়ি ভেঙে দিক, নোটিশ পাঠাক। আমি এসবের কাছে কোনও অবস্থাতেই মাথা নত করব না। এমন মানসিকতার মুখ্যমন্ত্রী বাংলা আগে কখনও দেখেনি।'
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানও কম নাটকীয় নয়। তৃণমূলের যুব সংগঠন থেকে রাজনীতিতে উঠে এসে তিনি দ্রুতই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রকে তিনি নিজের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন। একসময় বিরোধীদের কটাক্ষে তিনি 'ভাইপো' নামে পরিচিত হলেও পরে নিজেকে দলের 'সেনাপতি' হিসেবেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ, বিরোধীদের কটাক্ষ, সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক স্টাইল ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপিকে একাধিকবার প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জও করেছিলেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সেই আত্মবিশ্বাসই এখন অনেকের চোখে অহংকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বাড়িটিকে ঘিরেও বছরের পর বছর নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছে। কেউ বলতেন, বাড়ির ভিতরে এসকেলেটর রয়েছে। কেউ বলতেন, সোনার কল বা বিদেশি মার্বেলের ব্যবহার হয়েছে। এসবের কতটা সত্যি, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বাড়ি ধীরে ধীরে এক ধরনের ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এখন অনেকের মতে, হরিশ মুখার্জি রোড যেন নতুন এক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এক বাসিন্দার কথায়, 'এটা শুধু একটা বাড়ি নয়, এটা একটা সময়ের প্রতীক। আর আজ মানুষ বুঝতে পারছে, রাস্তা আবার মানুষের কাছেই ফিরে এসেছে।'