• ত্বিষার মৃতদেহের আরও অবনতির আশঙ্কা, সংরক্ষণের ব্যবস্থাই নেই মর্গে! একাধিক প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে মৃতার পরিবার
    এই সময় | ২০ মে ২০২৬
  • প্রাক্তন ‘মিস পুনে’, মডেল-অভিনেত্রী ত্বিষা শর্মার রহস্যমৃত্যুতে এখনও অধরা একাধিক প্রশ্নের উত্তর। দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তের অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্য়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করা হয়েছে পরিবারের তরফে। মেয়ের মৃত্যুর সঠিক তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত দেহ ফেরত নেবেন না বলে জানিয়েছেন ত্বিষার বাবা। এ দিকে ত্বিষার মৃতদেহে পচন ধরতে শুরু করেছে বলে জানিয়ে দেহ ফেরত নেওয়ার অনুরোধ করেছে ভোপাল পুলিশ।

    পুলিশি তদন্তে আপাতত যা জানা গিয়েছে:

    সমর্থ সিংহের খোঁজ দিতে পারলে ১০ হাজার টাকার পুরস্কার দেওয়া হবে বলে পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে। মামলার তদন্তে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। তদন্তভার সিবিআই (CBI)-এর হাতে তুলে দেওয়া হোক, এই দাবি জানিয়ে মধ্য়প্রদেশের মুখ্য়মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় সংস্থাকে চিঠি লিখবেন বলেও খবর পাওয়া গিয়েছে (এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময় পর্যন্ত)। এ দিকে, ভোপালর পুলিশের দাবি, এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী ত্বিষার মৃত্যু ‘খুন নয়, আত্মহত্যা’।

    এই ঘটনায় সবথেকে বড় গাফিলতি নজরে এসেছে ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে। AIIMS ভোপালের রিপোর্ট অনুযায়ী, যে বেল্টের উল্লেখ করা হয়েছে ত্বিষার গলার ফাঁসকে কেন্দ্র করে, সেটি তদন্তকারী অফিসার ময়নাতদন্তের সময় প্রথমে জমাই দেননি। ফলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা গলার দাগের সঙ্গে ওই বেল্টের মিল খতিয়ে দেখতে পারেননি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রমাণ নষ্ট বা গোপন করার অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশও এই ‘ল্যাপস’ বা গাফিলতির কথা স্বীকার করে। একইসঙ্গে ত্বিষার পরিবারের আইনজীবী আদালতে প্রশ্ন তোলেন যে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃতার শরীরে থাকা আঘাতের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। অথচ ত্বিষার কানের পিছনে এবং শরীরের অন্যান্য অংশেও একাধিক ‘অ্যান্টিমর্টেম ইনজুরি’ বা মৃত্যুর আগে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি।

    কী বলছেন ভোপালের পুলিশ কমিশনার?

    ভোপালের পুলিশ কমিশনার সঞ্জয় কুমার NDTV-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘পোস্টমর্টেমের প্রাথমিক রিপোর্ট এবং প্রাথমিক তদন্তে এখনও পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তাতে এটি আত্মহত্যার ঘটনাই বলে মনে হচ্ছে, খুন নয়। আমাদের তদন্ত অনুযায়ী এটি অ্যান্টি-মর্টেম হ্যাঙ্গিং-এর ঘটনা।’ অর্থাৎ মৃত্যুর আগেই গলায় ফাঁস লাগানো হয়েছিল। পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, শরীরে এমন কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি যা, সরাসরি খুনের ইঙ্গিত দেয়।

    ত্বিষাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। পরিবারের দাবি, তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করার পরে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ পুলিশকে আগে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়নি। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলের প্রাথমিক ফরেনসিক প্রক্রিয়া আদৌ সঠিকভাবে মানা হয়েছিল কি না। এই কারণে বাড়ির CCTV ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ত্বিষার পরিবারের দাবি, ভোপালের বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও ত্বিষাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে। 

    ঘটনার টাইমলাইন নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ত্বিষার পরিবারের দাবি, মৃত্যুর ঠিক আগে রাত ১০টা ৫ মিনিটে তিনি মাকে ফোন করে অত্যাচারের কথা জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, কথোপকথনের মাঝখানে সমর্থ সিং ঘরে ঢুকতেই ফোন কেটে যায়। এর মাত্র ১৫ মিনিট পরে পরিবারকে জানানো হয় ত্বিষা ‘শ্বাস নিচ্ছেন না’। এই ১৫ মিনিটে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটাই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন।

    তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন বাড়ির CCTV ফুটেজও। সিং বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, সন্ধে ৭টা ২০ মিনিটের দিকে ত্বিষা সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে যাচ্ছেন। এর পরে রাত ৮টা ২০ মিনিট নাগাদ ত্বিষার স্বামী সমর্থ-সহ তিনজনকে তাঁর মরদেহ নিচে নামিয়ে আনতে দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঝের এক ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজেরও খোঁজ করা হচ্ছে।

    FIR-এ ত্বিষার মৃত্যুর সময় রাত ১০টা ৫০ মিনিট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সিসিটিভি ফুটেজে মরদেহ নামিয়ে আনার সময়ের সঙ্গে তিন ঘণ্টার ব্যবধান! এই ব্যবধান নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। আদালত খতিয়ে দেখেছে যে, সিসিটিভি ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্পটি ভুল ছিল কি না। নাকি মৃত্যুর সময় ভুলভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল? এই ব্যবধান নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে মডেল-অভিনেত্রীর পরিবার।

    এখানেই শেষ নয়, ত্বিষা শর্মার বয়স এবং ব্যক্তিগত বিবরণ সম্পর্কেও FIR-এ একাধিক অসঙ্গতি নজরে এসেছে। সেখানে এক জায়গায় মৃতার জন্ম তারিখ ১৬ এপ্রিল, ১৯৮৭ হিসেবে নথিভুক্ত করা হলেও, অন্য অংশে তাঁর বয়স ৩৩ বছর এবং অন্যত্র ৩১ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকী ত্বিষার পরিবারের দাবি, তাঁদের মেয়ের উচ্চতাও ভুল লেখা হয়েছে। এই অসঙ্গতিগুলো নিছক কেরানিজনিত ভুল নয়, বরং তদন্তে ত্রুটির ইঙ্গিত বলে সরব ত্বিষা শর্মার পরিবার।

    আদালতে ত্বিষার আইনজীবী AIIMS-এ ময়নাতদন্তের সময়ে তাঁর শাশুড়ির বোনের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। উল্লেখ্য, শাশুড়ি গিরিবালা সিং একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড সেশনস জজ এবং তাঁর বোন বনশল হাসপাতালে কাজ করেন। যার ফলে ত্বিষার আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন যে, ময়নাতদন্ত চলাকালীন বনশল হাসপাতালের ওই কর্মীকে কেন এইমসে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

    এই সব ফাঁক উল্লেখ করেই মৃতদেহ সংরক্ষণকে ঘিরে দ্বিতীয় বার পোস্টমর্টেমের দাবি তুলেছে ত্বিষার পরিবার। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রদেশের বাইরে স্বাধীন তদন্তেরও আবেদন জানিয়েছে শর্মা পরিবার। এ দিকে পুলিশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মর্গে রাখা থাকায় দেহটি ধীরে ধীরে পচতে শুরু করেছে এবং অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আগে পরিবারের উচিত দেহ গ্রহণ করা।

    পুলিশ সূত্রে খবর, বর্তমানে ত্বিষার দেহ AIIMS ভোপালের মর্গে মাইনাস ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় দেহ অক্ষত রাখতে হলে মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন, যে সুবিধা AIIMS ভোপালে নেই। ফলে দেহের অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বার পোস্টমর্টেমেও জটিলতা তৈরির অশনি সঙ্কেত দেখছে পরিবার।

  • Link to this news (এই সময়)