উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডের অন্তর্গত বান্দা জেলা। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু সঙ্কটের মানচিত্রে পৃথিবীর অন্যতম উত্তপ্ত এলাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই জেলা। মে মাসের চড়া রোদে এই জেলার তাপমাত্রা বিপজ্জনক সমস্ত স্তর অতিক্রম করে যাচ্ছে। ১৯ মে বান্দার পারদ ছুঁয়েছে রেকর্ড ৪৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মরশুমে সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ২৭ এপ্রিল এই জেলা ৪৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে সারা বিশ্বের ৮,০০০ আবহাওয়া কেন্দ্রের মধ্যে শীর্ষ স্থানে ছিল। আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিস্থিতি ঋতু পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিক ভাবে ঘটেনি। এটি আসলে একটি অঞ্চলের ‘ইকোলজিক্যাল কোলাপ্স’ অর্থাৎ, পরিবেশ সম্পূর্ণ রূপে ধসে যাওয়ার ছবি।
বান্দা জেলা রাতারাতি এশিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত এলাকা হয়ে ওঠেনি। এর নেপথ্যে রয়েছে এই জায়গার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রকৃতির মার এবং বিগত কয়েক দশক ধরে চলা মানুষের লাগামহীন লোভ ও উন্নয়নের ভুল নীতি:
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের লখনৌ কেন্দ্রের সিনিয়র বিজ্ঞানী মহম্মদ দানিশ জানিয়েছেন, থর মরুভূমি থেকে আসা অতি শুষ্ক পশ্চিমী বাতাস সরাসরি বয়ে যায় দক্ষিণ উত্তরপ্রদেশের উপর দিয়ে। মে মাসের শুরুতে উত্তর ভারতের বহু অংশে ‘পশ্চিমী ঝঞ্ঝা’ বা মেঘ-বৃষ্টির দেখা মিললেও বুন্দেলখণ্ড অঞ্চল সম্পূর্ণ শুষ্ক ও মেঘমুক্ত ছিল। ফলে তীব্র সৌর বিকিরণ সরাসরি এই এলাকার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বুন্দেলখণ্ডের মাটি অত্যন্ত শক্ত এবং পাথুরে। এই উন্মুক্ত পাথুরে পৃষ্ঠ সরাসরি সূর্যের আলোয় অত্যন্ত দ্রুত উত্তাপ শোষণ করে এবং তা ধরে রাখে। সূর্যাস্তের পরে এই পাথর অত্যন্ত ধীরগতিতে তাপ বিকিরণ করে। ফলে রাতের বেলাতেও এই অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এর ফলে বান্দা একটি স্থায়ী ‘হিট আইল্যান্ড’ অর্থাৎ, উত্তাপের দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, প্রকৃতির চেয়েও মানুষের কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত বান্দাকে এই নরককুণ্ডে পরিণত করেছে। তাঁদের রাজ্যকে এক্সপ্রেসওয়ের রাজ্য বলে গর্ব করে যোগী আদিত্যনাথ সরকার। কিন্তু এই এক্সপ্রেসওয়ে তৈরিরও একটা বড় অবদান আছে বান্দায় এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য। উত্তরপ্রদেশ বন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির সময়ে এই পুরো করিডরে প্রায় ১.৮৯ লক্ষ গাছ কাটা হয়েছে। এর একটা বড় অংশ ছিল বান্দা জেলায়।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গত ২০ বছরে বান্দার বনভূমি প্রায় ১৫% কমে গিয়েছে। ২০০৫ সালে যেখানে বান্দার মোট বনভূমি ছিল ১২০ বর্গকিলোমিটার, ২০২৫-এ তা মাত্র ৯৫ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। বর্তমানে এই জেলার Green Cover বা সবুজের আচ্ছাদন রয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ এলাকায়। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির তুলনায় যা নগণ্য।
বান্দার বুক চিরে গিয়েছে বিন্ধ্য পর্বতমালা। এর বেলেপাথরের স্তর প্রাকৃতিক ভাবে বৃষ্টির জল শোষণ করে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বজায় রাখত। কিন্তু গত দুই দশক ধরে দেদার ডিনামাইট বিস্ফোরণ ও পাথর ভাঙার ক্রাশার মেশিন চলার কারণে এই পাহাড়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ক্রাশার মেশিনের ফলে তৈরি সূক্ষ্ম ধুলো মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি রুখে দিয়েছে।
বুন্দেলখণ্ডের অন্যতম প্রধান নদী ‘কেন’ (Ken) বান্দার উপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সক্রিয় নদীগর্ভে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই সব নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভারী মেশিন দিয়ে খনন করে এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক বালি তোলা হচ্ছে। লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিদ্যার অধ্যাপক, ধ্রুব সেন সিংয়ের মতে, নদীগর্ভ থেকে এ ভাবে বালি তোলার ফলে ফলে নদীর জল ধারণ ক্ষমতা এবং অববাহিকার স্বাভাবিক শীতলীকরণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে তা তাপ শোষণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
বান্দা জেলার এই ভয়াবহ রূপান্তরকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ ভূবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, এটি আসলে প্রকৃতির দেওয়া এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা: অবিলম্বে নিজেদের সংশোধন না করতে পারলে সমগ্র উত্তর ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্যই নষ্ট হয়ে যাবে।
বান্দা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক দিনেশ সাহা এবং অধ্যাপক ধ্রুব সেন সিংয়ের মতো বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ধুলোঝড়, পাহাড় ধ্বংস এবং বালি মাফিয়ার দাপটে বান্দার যে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ছিল, তা আজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এই নরককুণ্ড থেকে মুক্তি পেতে হলে অবিলম্বে প্রশাসনকে উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় মাঠে নামতে হবে।
কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে ব্যাপক হারে বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ করতে হবে। একই সঙ্গে নদীর বুক বেআইনি ভাবে বালি তোলা সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে ধরে রাখতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের উপরে জোর দিতেই হবে। আর এই সবকিছুই করতে হবে এখনই। না হলে আগামী দুই দশকের মধ্যে বান্দা জেলা আর বসবাসের যোগ্য থাকবে না, উষর মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।