বীরভূম: পাঁচশোর বেশি অবৈধ পাথর খাদান চলছে, এফআইআর প্রশাসনের
বর্তমান | ২১ মে ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: খাতায়-কলমে বৈধ পাথর খাদানের সংখ্যা মাত্র ১২। অথচ বাস্তবে বীরভূমে রমরমিয়ে চলছে অন্তত পাঁচশোটি অবৈধ খাদান! রায়তি জমি, সরকারি খাসজমি থেকে শুরু করে সবুজ জঙ্গল, কালো পাথরের লোভে মাফিয়াদের গ্রাসে চলে গিয়েছে সবটাই। দিন-রাত একনাগাড়ে ফাটছে ডিনামাইট, বাতাসে উড়ছে পাথরের কণা। ফলে বীরভূমের বিস্তীর্ণ এলাকায় আজ সিলিকোসিসের মতো মারণ রোগ ঘরে ঘরে। বিঘার পর বিঘা চাষের জমি ঢেকে যাচ্ছে সাদা ধুলোর চাদরে। আর ওভারলোডেড লরির দাপটে গ্রামীণ রাস্তার কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে।
নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বহু অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। হাতজোড় করেছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিধায়কদের কাছেও। কিন্তু লাভ হয়নি। এতকাল রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসনের কর্তাদের একাংশ থেকে শুরু করে প্রভাবশালীদের ‘মাসোহারা’ দিয়ে সমান্তরাল রাজত্ব কায়েম হয়েছিল বলে অভিযোগ। জমানা বদলাতেই এতদিনের ‘ধৃতরাষ্ট্র’ প্রশাসন নবান্নের নির্দেশে নড়েচড়ে বসল।
শুরুটা হয়েছে মহম্মদবাজার থেকে। ব্লকের বিএলএলআরও বুধবার থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে জানিয়েছেন, মহম্মদবাজারের হাটগাছা মৌজায় গিরিজোড় হাইস্কুলের সীমানা থেকে মাত্র ১৫০ মিটারের মধ্যে একটি অবৈধ পাথর খাদান চলছে। কোনো বৈধ লিজ, পারমিট বা সরকারি চালান ছাড়াই বিশাল গর্ত খুঁড়ে পাথর তোলা হচ্ছে। সরকারের ঘরে এক পয়সাও রাজস্ব জমা পড়েনি। স্কুলের এত কাছে যেভাবে ডিনামাইট ফাটিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছিল তা ছাত্রছাত্রীদের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এই ঘটনায় এলাকারই চার দাপুটে ও প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
তবে পাথর কারবারিদের একাংশের দাবি, ‘ঠগ বাছতে তো গাঁ উজাড় হয়ে যাবে!’ ক’জনের বিরুদ্ধে এফআইআর করবে প্রশাসন? বীরভূমের সিংহভাগ খাদানই তো অবৈধ। এতদিন বেআইনিভাবে পাথর তুলে স্রেফ সরকারি জরিমানা বা ডিসিআর কেটেই খাতায়-কলমে ‘বৈধতার’ তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। অভিযোগ, নিয়ম ভাঙার এই খেলায় জড়িয়ে আছেন তৃণমূলের একাধিক দাপুটে পদাধিকারী থেকে কেষ্টবিষ্টুরা। বেআইনি খাদানে ধস নেমে বহু দুঃস্থ শ্রমিকের অকালমৃত্যু হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা এতদিন হাত-পা গুটিয়ে বসেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিকের স্বীকারোক্তি, ‘যাঁর ইশারায় এতদিন জেলা প্রশাসন চলত, তিনিই আমাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছিলেন। অ্যাকশন নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না।’ কিন্তু উপরতলার সেই নিয়ন্ত্রণ সরতেই নবান্নের কড়া নির্দেশে এখন বেআইনি কারবারে রাশ টানতে কোমর বাঁধছে ভূমিদপ্তর।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাম আমলে এই কারবারে দুর্নীতি থাকলেও তার উপর সরকারের একটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু তৃণমূল জমানায় তা প্রকাশ্য লুটের পর্যায়ে পৌঁছয়। মহম্মদবাজার, রামপুরহাট ছাড়িয়ে নলহাটি, মুরারই থেকে রাজগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় রাতারাতি গজিয়ে ওঠে শয়ে শয়ে বেআইনি খাদান ও হাজারের কাছাকাছি ক্র্যাশার। কোথাও আদিবাসীদের জমি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়, কোথাও উধাও হয় কৃষিজমি। নিয়ম অনুযায়ী, একটি পাথর খাদান চালাতে গেলে ভূমি দপ্তর, পরিবেশ দপ্তর সহ একাধিক মহলের ছাড়পত্র লাগে। বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য অনুমতি নিতে হয় ‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ মাইনস সেফটি’ -র থেকে। বীরভূমের বেআইনি কারবারে এসব নিয়মের কোনো বালাই ছিল না।
ভূমিদপ্তরের এক পদস্থ কর্তা বলেন, অবৈধ খাদান পুরোপুরি বন্ধ করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। তবে আমরা খতিয়ে দেখেছি, জেলায় অন্তত এমন ৭০টি খাদান রয়েছে, যেগুলি সবরকম সরকারি নিয়ম মেনে বৈধভাবে চালানো সম্ভব। ধাপে ধাপে সেগুলোকে চালু করাই আমাদের লক্ষ্য। তৃণমূলের জেলা সহ সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, সবকিছু আইন মেনে হওয়া উচিত।