আজকাল ওয়েবডেস্ক: আরজি কর কাণ্ডের পর থেকেই এ রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চিকিৎসক মহল—সবার মধ্যেই একটা চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। হাসপাতাল চত্বরে ডাক্তার ও নার্সদের সুরক্ষার অভাব এবং বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এবার সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে এবং কলকাতার সমস্ত বড় সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা খোলনলচে বদলে ফেলতে একগুচ্ছ নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপের ঘোষণা করল কলকাতা পুলিশ।
গত ১৯শে মে, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় (লালবাজার) থেকে একটি বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে । ‘কমিশনারস অর্ডার নম্বর ২৫৬’ নামের এই নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এবার থেকে কলকাতার প্রতিটি বড় হাসপাতালে নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে থাকবেন একজন করে বিশেষ পুলিশ অফিসার বা ‘অফিসার-ইন-চার্জ’ (OC Hospital) । হাসপাতাল চত্বরে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই হবে এই ওসির প্রধান কাজ ।
নতুন এই নিয়মে হাসপাতালগুলির প্রবেশ ও প্রস্থান পথে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে । কোনও বহিরাগত বা রোগী ছাড়া অতিরিক্ত কোনও ব্যক্তি যাতে বিনা কারণে ভেতরে ঢুকতে না পারে, তার জন্য মূল গেটগুলিতেই কঠোর তল্লাশি চালানো হবে । বিশেষ করে হাসপাতালের সিসিইউ (CCU) বা আইসিইউ-র (ICU) মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি বিভাগগুলিতে সাধারণ মানুষের ভিড় জমানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে । একই সাথে ওপিডি (OPD) এবং জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টারগুলিতে লাইনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সদা তৎপর থাকবে । হাসপাতাল চত্বরে দালাল রাজ পুরোপুরি বন্ধ করতে পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ।
হাসপাতালের ভেতরে থাকা সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরা সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং তদন্তের প্রয়োজনে সমস্ত ফুটেজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । শুধু তাই নয়, হাসপাতালে কর্মরত সমস্ত বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড, চুক্তিতে থাকা কর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে একটি ‘ডেটা ব্যাঙ্ক’ বা বিশেষ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কারোর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
রাত নামলেই সরকারি হাসপাতালগুলিতে যে ভুতুড়ে ও থমথমে পরিবেশ তৈরি হতো, তা রুখতে এবার থেকে রাতে নিয়মিত পুলিশের টহলদারি বা নাইট রাউন্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহিলা ডাক্তার ও নার্সদের হোস্টেলগুলির সুরক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে । চত্বরের কোথাও যাতে অন্ধকার না থাকে, তার জন্য আলোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং তালাচাবির নিরাপত্তা প্রতি রাতে ওসি নিজে খতিয়ে দেখবেন । এছাড়া আগুন লাগার মতো আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের সমস্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি বালি ও জলের বিকল্প বন্দোবস্তও মজুত রাখা হবে ।
যেকোনও ধরণের অশান্তি, ভাঙচুর বা চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে সঙ্গে লালবাজার কন্ট্রোল রুম এবং স্থানীয় থানাকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে খবর দিতে হবে । চিকিৎসকদের সুরক্ষায় হাসপাতালের দেওয়ালে দেওয়ালে হেল্পলাইন নম্বরও স্পষ্ট করে লিখে দেওয়া হবে। লালবাজারের এই অল-রাউন্ড নির্দেশিকা কার্যকর হলে কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলির চেহারা যে আমূল বদলে যাবে এবং চিকিৎসকেরা অনেকটাই নির্ভয়ে কাজ করতে পারবেন, সেই আশাই এখন করছে ওয়াকিবহাল মহল।