আজকাল ওয়েবডেস্ক: পালাবদলের পরেই রাজ্যের সব পুরসভাগুলিকে দুর্নীতিমুক্ত করার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবার সেই লক্ষ্যেই পুরসভাগুলির কাজকর্ম স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে কোমর বাঁধল রাজ্য প্রশাসন। রাজ্যের একাধিক পুরসভার চেয়ারম্যান, এক্সিকিউটিভ অফিসার, ফিনান্স অফিসার এবং পুরসভার অন্য সরকারি পদাধিকারীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠক সারলেন পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী ও আধিকারিকেরা। প্রশাসন সূত্রের খবর, এই বৈঠকে পুরপ্রধানদের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিক পরিষেবা উন্নত করতে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর নির্দেশ, প্রত্যেক পুরসভায় ‘অ্যাডভাইজার’ বা উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন স্থানীয় বিধায়ক। প্রশাসনের যুক্তি, এতে কাজে স্বচ্ছতা আসবে এবং একচেটিয়া সিদ্ধান্ত বন্ধ হবে।
এই প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদের বিজেপি বিধায়ক গৌরীশংকর ঘোষ বলেন, “বিগত সরকারের আমলে পুরসভাগুলিকে কার্যত বিরোধীশূন্য করা হয়েছিল। বিরোধীদের ভোট দিতে দেওয়া হত না, কিংবা কিনে নেওয়া হত। ফলে তৃণমূল পরিচালিত পুরসভাগুলি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। এবার পুরসভাগুলিকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং আইন মেনে কাজ চালাতে স্থানীয় বিধায়কদের পুরসভা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, “ইতিমধ্যেই জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভার সরকারি আধিকারিক আমাকে ফোন করে উপদেষ্টা হিসেবে পুরসভায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন । মুর্শিদাবাদ পুরসভা থেকেও আজ আধিকারিকেরা আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছেন।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধায়করা উপদেষ্টা হলে টেন্ডার, নিয়োগ ও প্রকল্প রূপায়ণে নজরদারি বাড়বে এবং নাগরিক পরিষেবায় গতি আসবে ও আর্থিক বেনিয়ম কমবে।
বিধায়কদের পুরসভার 'অ্যাডভাইজার' পদে নিযুক্ত করে শুধু ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিয়েছে প্রশাসন তা নয়, ওই বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এখন থেকে সরকারের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা ছাড়া কোনও ঠিকাদার বা কনট্রাক্টরের কাজের বকেয়া টাকা রিলিজ করা যাবে না। শুধু তাই নয়, পুরসভাগুলিতে কাজের স্বচ্ছতা আনতে এখন থেকে যে কোনও কাজের ‘ওয়ার্ক অর্ডার’ বের করার আগে জেলাশাসক বা অতিরিক্ত জেলাশাসককে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, যে সমস্ত পুরসভায় অতিরিক্ত কর্মী থাকার কারণে আর্থিক অব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পুরসভাগুলিতে কর্মরত একাধিক চুক্তিভিত্তিক কর্মী কাজ হারাতে পারেন বলেও সূত্রের খবর।
পাশাপাশি পুরসভায় দুর্নীতি দমনে বড়সড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এখন থেকে কোনও ধরনের ম্যানুয়াল বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন করা হবে না। যে কোনও বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন করতে হলে তা সম্পূর্ণ অনলাইনেই করতে হবে। পাশাপাশি, যেসব ক্ষেত্রে পুরসভার রাজস্বের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে খুব শীঘ্রই পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের তরফ থেকে একটি ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হতে চলেছে।
পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিকদের কড়া বার্তা , নাগরিক পরিষেবার স্বার্থে প্রতিদিন রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষরা যে সমস্ত রাস্তা দিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বের হন, সেগুলি পরিষ্কার রাখতেই হবে। খারাপ রাস্তার আলো দ্রুত সারানোর নির্দেশও দেন তারা।
এছাড়া পুর এলাকাগুলিতে যানজট নিয়ন্ত্রণে বর্ষা আসার আগেই দ্রুততার সঙ্গে কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তৈরি করতে হবে বিনামূল্যে পার্কিংয়ের জায়গাও। কোন কোন জায়গায় 'পেইড পার্কিং' হবে, তা পুর কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট করতে হবে। তাছাড়া পুর এলাকার যে কোনও বাজারে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। পুর দপ্তরের তরফে, আসন্ন বর্ষার মরসুমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোর দিতে দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুর এলাকার পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আধিকারিকেরা নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতিদিন নিয়ম করে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। যদি কোনও পুর এলাকায় আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকে, তবে তা দ্রুত পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরকে জানাতে হবে এবং জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।শুধু তাই নয় , কাজের গতি ও নজরদারি ঠিক রাখতে এখন থেকে প্রত্যেক মাসে জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং মহকুমা শাসকদের সঙ্গে পুর কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের চারটি পুরসভার পুরবোর্ড ভেঙে দিয়েছে রাজ্য সরকার । সেখানে পুর বোর্ড পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট এলাকার মহকুমা শাসককে। প্রশাসনের এই কড়া মনোভাবের পর রাজ্যের পুর-পরিষেবায় বড়সড় রদবদল আসতে চলেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।