বকরি ইদে ‘ধর্মীয় কারণে’ গো বলিতে ছাড় দেওয়া যায় কিনা, তা ২৪ ঘন্টার মধ্যে খতিয়ে দেখতে রাজ্যকে নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে বকরি ইদকে সামনে রেখে কসাইখানা চালানো ও গো বলি নিয়ে দায়ের ১১ মামলার শুনানি শেষে রাজ্যের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিই বজায় রেখেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে খারিজ করেছে মামলাকারীদের বিজ্ঞপ্তি খারিজের আবেদন।
প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ রায়ে জানিয়েছে, যেহেতু ১৯৫০ সালের এই সংক্রান্ত আইনে ধর্মীয়, চিকিৎসা ও গবেষণার মতো কারণে পশু বলিতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাই এই ক্ষেত্রে ধর্মাীয় কারণে ছাড় দেওয়া যায় কিনা, তা বিবেচনা করুক সরকার। অর্থাৎ, এই বিষয়ে বল এখন রাজ্যের কোর্টেই।
আগামী বুধবার (২৭ মে) বকরি ইদ। তার ঠিক আগে বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজ্যে গবাদি পশু জবাই এবং পশু কেনাবেচা নিয়ে জারি হওয়া কড়া সরকারি বিজ্ঞপ্তি ঘিরে তীব্র আইনি লড়াই দেখা গেল কলকাতা হাইকোর্টে। পালাবদলের পরে রাজ্যে ১৯৫০ সালের ‘পশু হত্যা নিয়ন্ত্রণ আইন’ (West Bengal Animal Slaughter Control Act, 1950) কঠোর ভাবে বলবতের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্য সরকারের এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে মোট ১১টি মামলায় ১দ জন আইনজীবী সওয়াল করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশিষ্ট CMI(M) নেতা তথা সিনিয়র আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য-ও। জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের পক্ষে সওয়াল করেন তিনি।
আদালতে ১৯৫০ সালের আইনের ধারাগুলির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন মামলাকারীদের আইনজীবীরা। তাঁরা জানান, দৃশ্য দূষণ ও স্বাস্থ্যের কারণে বকরি ইদে যদি প্রকাশ্যে গবাদি পশু জবাই বন্ধ করতে হয়, তা হলে একই নিয়ম ছাগল বলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তাঁদের মতে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি বাস্তবে কার্যকর করা এক প্রকার অসম্ভব। রাজ্যে কত কসাইখানা আছে, কতজন ভেটেনারি ডাক্তার আছেন— তার কোনও সঠিক হিসেব নেই সরকারের কাছে। কোনও গোরুর বয়স ১৪ বছর নাকি ১৫ বছর, তা কী ভাবে বোঝা যাবে? এই প্রশ্নও তোলেন তাঁরা।
তাঁরা আরও জানান, মূল আইন এবং রাজ্যের জারি করা বিজ্ঞপ্তির মধ্যে ফারাক আছে। আইনে বলা হয়েছে কোন গবাদি পশু জবাই করা যাবে, কলকাতায় তার সার্টিফিকেট দেবে কলকাতা পুরসভা (KMC), অন্যান্য পুর এলাকায় স্থানীয় পুরপ্রধান। কিন্তু রাজ্যের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে সার্টিফিকেট দেবেন পুরসভার প্রেসিডেন্ট বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি।
মামলাকারীদের আরও দাবি, ১৯৫০ সালের আইনটি বর্তমান সময়ে অচল। বর্তমান সময়ের বাস্তবচিত্রের সঙ্গে আইনটির কোনও মিল নেই।
একইসঙ্গে রাজ্যের জারি করা বিজ্ঞপ্তিকেও চ্যালেঞ্জ করেন তাঁরা। তিনি জানান, রাজ্য বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও তা কার্যকর করার মতো পরিকাঠামোই নেই। তাঁরা আরও দাবি করেন, সরকার এই বিজ্ঞপ্তি জারির ফলে রাজ্যের সব গোরুর হাট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কাজেই শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই এই বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। অনেকেই শুধুমাত্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়াতেও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
পাল্টা রাজ্যের পক্ষের আইনজীবীরা জানান, রাজ্য সরকার নিজে উদ্যোগী হয়ে কিছু করেনি। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। রাজ্যের প্রশ্ন, ‘কেউ হাইকোর্টের সেই মূল নির্দেশের রিভিউ বা পুনর্বিবেচনা চায়নি, সবাই শুধু বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এটি রাজ্যের একটি ‘পলিসি ডিসিশন’ বা নীতিগত সিদ্ধান্ত, যা জনস্বার্থ মামলায় এ ভাবে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।’
কলকাতা পুরসভার (KMC) পক্ষ থেকে বলা হয়, এই বিজ্ঞপ্তি হুট করে দেওয়া হয়নি। প্রতি বছরই নিয়ম মেনে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করা হয়। তারা আরও জানিয়েছে, আইন ভাঙার দায়ে ইতিমধ্যেই ৬১০টি ঘটনায় পদক্ষেপ করা হয়েছে। পরিকাঠামোর অভাবের কথাও মানতে চায়নি KMC। তারা জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব চিহ্নিত কসাইখানা, পরিকাঠামো এবং কর্মী-চিকিৎসক রয়েছে।
দুই পক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি শোনার পরে আদালত জানায়, রাজ্যের জারি করা বিজ্ঞপ্তি তারা বহাল রাখছে। কারণ, কোনও প্রকাশ্য স্থানে গোরু ও মহিষ-সহ অন্যান্য পশু জবাই করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, গোরু কোরবানি ‘ইদ-উল-আধা’ উৎসবের অংশ নয় এবং ইসলামে এটি কোনও ধর্মীয় আবশ্যিক বিধানও নয়। এই প্রসঙ্গে আদালত ‘মোহাম্মদ হানিফ কুরেশি ও অন্যান্য বনাম বিহার রাজ্য’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উল্লেখ করে। এর পরেই বকরি ইদে ‘ধর্মীয় কারণে’ গো বলিতে ছাড় দেওয়া যায় কিনা, সেই বিষয়টি রাজ্য সরকারকে বিবেচনা করে দেখার নির্দেশ দেয় আদালত।