• এফআইআর রুজুর নির্দেশ তিন দপ্তরের অফিসারদের বিরুদ্ধে, কঠোর প্রশাসন
    এই সময় | ২২ মে ২০২৬
  • এই সময়: প্রাতিষ্ঠানিক হোক বা প্রশাসনিক দুর্নীতিতে জ়িরো টলারেন্স নীতির কথা রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দুর্নীতিতে যাঁদের নাম জড়াবে, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং অভিযুক্ত সংস্থাকে ব্ল্যাক লিস্টেড করা হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, দুর্নীতিতে নাম জড়ানো সরকারি অফিসারদেরও রেয়াত করা হবে না। এ বার সেই অ্যাকশন শুরু হয়ে গেল। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত রাজ্যের তিন দপ্তরের অফিসারদের বিরুদ্ধে এ বার এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়া হলো। নবান্ন সূত্রের খবর, পঞ্চায়েত, খাদ্য এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের অভিযুক্ত অফিসারদের বিরুদ্ধে রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজিকে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

    তৃণমূল সরকারের জমানায় একের পর এক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে বাংলার বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। গ্রামীণ স্তরে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ, প্রকৃত উপভোক্তারা ঘর পাননি, অথচ তদানীন্তন শাসকদলের ঘনিষ্ঠরা প্রশাসনের মদতে ঘর পেয়ে গিয়েছিলেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে কাটমানিরও অভিযোগও উঠেছিল। অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বেআইনি ভাবে যাঁরা আবাস যোজনার বাড়ি পেয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যে সমস্ত সরকারি আধিকারিক ও পঞ্চায়েত স্তরের অফিসাররা নিয়ম ভেঙে এই অযোগ্যদের তালিকায় অনুমোদন দিয়েছিলেন, স্ক্রুটিনি না করে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন, প্রয়োজনে তাঁদের বিরুদ্ধেও সরাসরি এফআইআর দায়ের করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

    রাজ্যে রেশন কেলেঙ্কারি নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এই অভিযোগে রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে হাজতবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। যেখানে দুর্নীতিতে বৃহৎ ষড়যন্ত্র প্রমাণিত, সেখানে মন্ত্রী ছাড়া আর কেউ জড়িত নন, এমনটা যে সম্ভব নয়— তা মনে করছে প্রশাসন। তদন্তে দেখা গিয়েছে, মৃত ব্যক্তি বা অস্তিত্বহীন ভুয়ো কার্ডের ভিত্তিতে মাসের পর মাস রেশন সামগ্রী তুলে তা খোলা বাজারে পাচার করা হয়েছে। যাঁদের নামে বা যাঁদের মদতে এই ভুয়ো রেশন তোলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেই। কিন্তু এই চুরির চক্রে খাদ্য দপ্তরের যে সমস্ত ইনস্পেক্টর বা উচ্চপদস্থ অফিসারেরা যুক্ত ছিলেন বলে প্রমাণিত, তাঁদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন। সেই সমস্ত অভিযুক্ত অফিসারকে চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধেও অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

    জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের অধীনস্থ কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘জল জীবন মিশন’-এর মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কাজে বাংলায় বড় অঙ্কের আর্থিক তছরুপের অভিযোগও সামনে এসেছে। একাধিক এলাকায় দেখা গিয়েছে, অত্যন্ত নিম্নমানের পাইপ পাতা হয়েছে, যা অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও বহু জায়গায় কাগজে–কলমে কাজ হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। এই চক্রের পান্ডা যে সব ঠিকাদার ও সরবরাহকারী সংস্থা, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দপ্তরের যে ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকরা ওই নিম্নমানের কাজের বিল পাস করিয়ে সরকারি টাকা পাইয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেও এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    সাধারণ ভাবে কোনও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত বা বড়জোর সাসপেনশনের পথে হাঁটে সরকার। কিন্তু নতুন সরকার দুর্নীতির ক্ষেত্রে যে কোনও রকম নরম মনোভাব নিয়ে চলবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে নতুন প্রশাসন। শুভেন্দু একাধিকবার জানিয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হবে না। আমলা ও অফিসারদের নামে পুলিশে অভিযোগ দায়ের স্মরণাতীত কালের মধ্যে ঘটেছে বলে মনে করতে পারছেন না প্রবীণ আমলারা। সূত্রের খবর, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং পুলিশ–প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দুর্নীতিতে কার হাত রয়েছে বা কোন রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে, তা দেখার কোনও প্রয়োজন নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলেই অভিযোগ দায়ের করতে হবে।

  • Link to this news (এই সময়)