• তিন সদস্যের সিট গঠন, আরজি করের ঘটনায় ফের তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের
    এই সময় | ২২ মে ২০২৬
  • এই সময়: আরজি করের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের মামলায় তদন্তের ফাইল নতুন করে খোলার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। ওই ঘটনায় হাইকোর্ট আগেই সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিলে সুপ্রিম কোর্টও তাতে মান্যতা দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত প্রক্রিয়া চলার মধ্যে বৃহস্পতিবার সেই সিবিআইকে ধর্ষণ–খুনের ঘটনায় পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব দিল কলকাতা হাইকোর্ট–ই। বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশ, সিবিআইয়ের পূর্বাঞ্চলের যুগ্ম অধিকর্তার নেতৃত্বে নতুন করে তিন সদস্যের সিট গঠন করে তদন্ত করতে হবে। কোন পথে তদন্ত এগোবে তারও ইঙ্গিত দিয়ে আদালত জানায়, ২০২৪–এর ৯ অগস্ট গভীর রাতে চিকিৎসক তরুণীর ডিনার করা থেকে পরেরদিন দেহ পাওয়া এবং তারপরে এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেভাবে ঘটনাক্রম এগিয়েছে, গোটা বিষয়টিই তদন্তের আওতায় থাকবে। আদালত আরও জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিট গঠন করতে হবে। প্রয়োজনে নিহতের পরিবার কিংবা খুনে সাজাপ্রাপ্ত–সকলকেই নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে তদন্তকারী সংস্থা। আগামী ২৫ জুন মামলার তদন্তের অগ্রগতির রিপোর্ট জমা দিতে হবে আদালতে। যদিও নতুন করে তদন্তের নির্দেশের ফলে আগের তদন্তের স্ট্যাটাস কী হবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে আইনজীবীদের মধ্যে।

    এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে আরজি করের মামলা। তারই মধ্যে পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা নতুন আবেদনের শুনানিতে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্ট তদন্তের কেস ডায়েরি খতিয়ে দেখে এবং সওয়াল–জবাবের পরে বিস্ময় প্রকাশ করে। বিচারপতি ঘোষের বক্তব্য, ‘এই মামলা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন, তদন্তও বন্ধ হয়নি। অথচ এখনও তেমন কোনও অগ্রগতি চোখে পড়েনি। একে শুধুমাত্র তদন্তের ত্রুটি হিসেবে দেখলে চলবে না। তদন্তকারী আধিকারিক যা করেছেন, তাতে আমরা আপাতত অসন্তুষ্ট নই।’

    কেন নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আদালতের যুক্তি, ‘দায়িত্ব সিবিআইয়ের হাতে যাওয়ার আগে তদন্তে কিছু ত্রুটি বা গাফিলতির ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে। তবে আপাতত তদন্তের মূল ফোকাস হবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় এবং তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপর। আদালত এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মামলার গুরুত্ব, সামাজিক প্রভাব এবং অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনা করে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠনের জন্য বলা হচ্ছে।

    এ দিন শুনানির সময়ে পরিবারের আইনজীবী জয়ন্ত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় ও শীর্ষেন্দু সিংহ রায় দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের পিছনে একাধিক চক্র থাকার সম্ভাবনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তাঁরা বলেন, ‘একজন ব্যক্তির অডিও এবং ভিডিয়ো আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। যদিও এই মুহূর্তে কোনও নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করা হচ্ছে না।’ এ দিন বিষয়টি নিয়ে সওয়াল–জবাবের সময়ে তাঁদের সঙ্গে সিবিআইয়ের কৌঁসুলি রাজদীপ মজুমদারের বাদানুবাদ শুরু হয়ে যায়। কেন পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া উচিত, সেই যুক্তি দিতে গিয়ে জয়ন্ত ৯ অগস্ট সকালের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সেদিন সকালে চিকিৎসক তরুণীর মায়ের কাছে তিনটি কল এসেছিল। তাতে একেকবার একেক রকম তথ্য দেওয়া হয়। গোটা ঘটনায় কোনও না কোনও অসৎ উদ্দেশ্য বা গরমিল ছিল।’ আইনজীবী আরও দাবি করেন, ‘চরম জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবার সেদিন দুপুর ১২টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছোয়। তাঁদের তৃতীয় তলায় (চেস্ট বিভাগ) নিয়ে গিয়ে বিভাগীয় প্রধানের ঘরে বসিয়ে রাখা হয়। সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করানো হয়। এমনকী, কয়েকজন পুলিশ আধিকারিককে অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায়।’

    জয়ন্ত এবং শীর্ষেন্দু প্রশ্ন তোলেন, ‘বাবা-মাকে দেহ কেন দেখতে দেওয়া হয়নি? একটি উঁচু মঞ্চের উপর রাখা ছিল দেহটি। আঘাতের চিহ্নের মধ্যে দু’চোখ দিয়ে রক্তপাত দেখা গিয়েছিল, একটি হেয়ার ক্লিপও পাওয়া গিয়েছিল সেখানে। কিন্তু সেটি বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ আঘাতের উল্লেখও ছিল না।’ এই প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত এক ফরেনসিক মেডিসিন এক্সপার্টের মতামত উল্লেখ করে আইনজীবী বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা একজনের পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয় বলে তিনি মত দিয়েছেন।’ এ দিন শুনানির সময়ে মৃত তরুণীর বিধায়ক মা এবং বাবা ছলছলে চোখে দাঁড়িয়েছিলেন আইনজীবীদের পিছনে।

    বিচারপতি ঘোষ সিবিআইয়ের উদ্দেশে বলেন, ‘নতুন করে তদন্তের আবেদন করা হয়েছে। ৭ অক্টোবর, ২০২৪-এ নিম্ন আদালতে চার্জশিট জমা পড়েছে। তারপরেও সিবিআই এখনও তদন্ত করছে? তার মানে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি?’ সিবিআইয়ের তরফে রাজদীপ মজুমদার বলেন, ‘চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।’ বিচারপতি সে সময়ে প্রশ্ন করেন, ‘এক বছর সাত মাস কেটে গিয়েছে। তাহলে আপনারা কী করেছেন?’ এরপরেই আদালত নতুন করে ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়।

  • Link to this news (এই সময়)