• অযোধ্যা পাহাড়ের বনভূমি ও সরকারি জমি দখল করে হোটেল, রিসর্ট, অবৈধ নির্মাণের তদন্ত চাইছে বিজেপি
    বর্তমান | ২২ মে ২০২৬
  • সংবাদদাতা, ঝালদা: সবুজ অরণ্য, হাজারো পাখির কলতান আর বন্যপ্রাণের নিশ্চিন্ত ডেরা-অযোধ্যা পাহাড়ের এই চিরাচরিত পরিচিতিই আজ অস্তিত্বের সংকটে। যেদিন থেকে পাহাড়ের উপর ‘জমি হাঙ্গরদের’ লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে অরণ্য লুণ্ঠনের মহোৎসব। সরকারি খাস জমি থেকে শুরু করে বনাঞ্চল, এমনকি আদিবাসীদের পাট্টা পাওয়া জমিও আজ মাফিয়াদের দখলে। প্রতিদিন নিঃশব্দে হাতবদল হচ্ছে পাহাড়ের মাটি! আর সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো মাথা তুলছে একের পর এক বিলাসবহুল হোটেল ও রিসর্ট। তৃণমূল জমানার অবসানে রাজ্যে পরিবর্তন আসতেই এবার অযোধ্যা পাহাড় ও আশেপাশের সেই অবৈধ নির্মাণের তদন্ত চাইছে বিজেপি। 

    এক সময় মাও আতঙ্কে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিতেন অযোধ্যা থেকে। গত এক দশকে সেই পাহাড়ই সেজে উঠেছে নতুন সাজে। ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে থাকে পর্যটকদের। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পরিবেশপ্রেমীদের অভিযোগ, পাহাড়ের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক অবৈধ কংক্রিটের খাঁচা গড়ে তোলা হয়েছে। সরল আদিবাসীদের ভুল বুঝিয়ে, নানা আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে নামমাত্র মূল্যে জমি লিজে নিয়ে কোথাও কোথাও রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে রিসর্ট। বহু নির্মাণ তৈরি হয়েছে বনভূমি দখল করেও। যা ১৯৮০ সালের ‘বন সংরক্ষণ আইনে’র বিরোধী। তাছাড়া, ১৯৯৬ সালের গোদাবর্মন মামলায় সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, একবার যে জমি বনদপ্তরের নামে নোটিফায়েড, তার চরিত্র বা মালিকানা বদল করা যায় না। 

    বিজেপির অভিযোগ, পরিবেশ আইন আর পাহাড়ের নিয়ম-নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অরণ্যের বুক চিরে গড়ে ওঠা এই রিসর্টগুলির নেপথ্যে রয়েছে শাসকদলের প্রভাবশালী নেতাদের সরাসরি মদত। এতদিন প্রশাসন থেকে শুরু করে বনদপ্তর, সব পক্ষই যেন ছিল ‘অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র’। পাহাড়ের সবুজ ধ্বংস করে যখন কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হচ্ছিল, তখন এসি ঘরে বসে আধিকারিকরা কেবল ‘মধু’ খেয়েছেন, আর চোখ বুজে থেকেছেন। তাছাড়া এমনটা সম্ভব নয়। বাঘমুণ্ডির বিজেপির জেলা পরিষদ সদস্য রাকেশ মাহাত বলেন, ‘সরকারি সম্পত্তি দখল করে এই সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার পিছনে বড়ো বড়ো তৃণমূল নেতা ও প্রশাসনিক দপ্তরের কিছু আধিকারিকের যোগসাজশ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে পর্দা ফাঁস হবে।’

    স্থানীয় বাসিন্দাদেরও অভিযোগ, হোটেল, রিসর্টগুলিতে শীতের মরশুমে তারস্বরে ডিজে বাজে। এর দাপটে বন্যপ্রাণীরা যেমন অতিষ্ঠ, তেমনই বিঘ্নিত হচ্ছে শান্ত পাহাড়ী পরিবেশ ও খুদে পড়ুয়াদের পড়াশোনা। আদিবাসী সেঙ্গেল অভিযানের পুরুলিয়া জোনাল পারগানা মনোরঞ্জন হাঁসদা বলেন, তৃণমূলের আমলে জমি দখল ও অধিগ্রহণ করার কালচার চরম আকার নেয়। বিভিন্ন জায়গায় বন ভূমি বা সরকারি জমির উপর হোটেল গড়ে উঠছে। এনিয়ে আমরা বহুবার আন্দোলন করেছি। কিন্তু, কোনো লাভ হয়নি। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখন কমতে শুরু করেছে। অরণ্য ধ্বংস বা বন্যপ্রাণের উপর ক্ষতি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। এখন সরকার বদলেছে। আমরা এর সঙ্গে জড়িত আধিকারিক ও নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চাইছি।

    তৃণমূলের বরিষ্ঠ নেতা রথীন্দ্রনাথ মাহাত বলেন, যদি কেউ এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে শুধু মুখে বললে হবে না প্রমাণ করতে হবে। 

    ডিএফও অঞ্জন গুহকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, এই ধরনের অভিযোগ থাকলে খতিয়ে দেখা হবে।
  • Link to this news (বর্তমান)