• প্রকৃতির মার ! চলতি মরশুমে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে মালদার আমের ফলন
    eTV Bharat | ২২ মে ২০২৬
  • মালদা, 21 মে: আবহাওয়া অনুকূল ছিল ৷ এক দফায় নয়, দু'দফায় এসেছিল মুকুল ৷ সঠিক সময়ে মুকুলে ভরে গিয়েছিল গাছ ৷ সবাই ভেবেছিল, এবার জেলায় আমের রেকর্ড ফলন হবে ৷ কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, জেলাবাসীর আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে ৷ রেকর্ড ফলন দূর অস্ত, এবার গতবারের ফলনের ধারেকাছে পৌঁছোতে পারবে না আমের উৎপাদন ৷ কেন আশা জাগিয়েও আমের এমন ফলন, খোঁজখবর নিল ইটিভি ভারত ৷

    এবার আমের উৎপাদন সেভাবে হল না কেন?

    উদ্যানপালন ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতরের মালদা জেলার ডেপুটি ডিরেক্টর সামন্ত লায়েক ইটিভি ভারতকে বলেন, "এবার মালদায় প্রায় 31 হাজার 200 হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে ৷ বিভিন্ন প্রজাতির আম পাকার অবস্থায় চলে এসেছে ৷ এখানে অনেক প্রজাতির আম চাষ হয় ৷ এবার গাছে দুটি পর্যায়ে মুকুল এসেছিল ৷ মুকুলে ভরপুর বাগান দেখে আমরা আশা করেছিলাম, এবার ফলন ব্যাপক হবে ৷ কিন্তু পরে দেখা যায়, জেলার প্রায় 20 শতাংশ গাছে মুকুল সেভাবে ফোটেনি ৷ কিন্তু যেসব গাছে মুকুল ভালো ফুটেছে, সেই গাছে ফলন খুব ভালো ৷"

    তিনি আরও বলেন, "এই জেলায় হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, লক্ষ্মণভোগ, আম্রপালির মতো একাধিক প্রজাতি ধরে আমরা বিশ্লেষণ করেছি ৷ দেখেছি, ল্যাংড়া প্রজাতির গাছে ফল ঝরে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা বেশি ৷ বাকি প্রজাতিগুলির ফলন মোটামুটি ঠিক আছে ৷ আমাদের আশা, এবার জেলায় আমের উৎপাদন প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন হতে পারে ৷ গত বছর মালদায় আমের ফলন হয়েছিল প্রায় তিন লাখ 70 হাজার মেট্রিক টন ৷"

    আমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্যোগ

    ডেপুটি ডিরেক্টরের কথায়, "প্রাকৃতিক অনিশ্চিয়তার কারণে কোনও বছর বেশি, কোনও বছর আমের ফলন কম হয় ৷ এবার আমরা কৃষকদের বোঝাতে পেরেছি, আমের ভালো দাম পেতে গেলে তাঁদের উচ্চমানের ফল উৎপাদন করতে হবে৷ দেশের বিভিন্ন রাজ্য-সহ বিদেশেও মালদার আমের চাহিদা রয়েছে ৷ সম্প্রতি জেলা প্রশাসন, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র এবং সিআইএসএইচকে সঙ্গে নিয়ে আমরা কৃষকদের হর্টিনেট সার্টিফিকেট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি ৷ চাষিরা জৈব সার কখন ও কীভাবে ব্যবহার করবেন, কতটা পরিমাণে ব্যবহার করবেন, পোকামাকড়ের উপদ্রব হলে কোন কীটনাশক কীভাবে প্রয়োগ করবেন, এসব আমরা তাঁদের জানাচ্ছি ৷ আমরা উৎপাদিত আমের মান আরও বাড়াতে চাই ৷"

    তাঁর সংয়োজন, "এবার 50-60টি বাগানে আমরা ব্যাগিং সিস্টেম চালু করেছি ৷ কয়েকদিন আগে আমাদের এখানে মেঘলা আবহাওয়া ছিল ৷ খানিক বৃষ্টি হয়েছে ৷ এতে কিছু জায়গায় আমে শুলিপোকা আর মিলিবাগের উপদ্রব হয়েছে ৷ শুলিপোকার উপদ্রবে ফল মাটিতে পড়ে যায় ৷ তেমন দেখলে সেই ফল মাটিতে পুঁতে দিলে ভালো হয় ৷ তাহলে ওই পোকার লার্ভা উপদ্রব করতে পারবে না ৷ আর মিলিবাগের আক্রমণ বেশি হলে কোনও সংবেদনশীল কীটনাশক স্টিকারে মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো হয় ৷"

    আমের ফলন

    মালদা ম্যাঙ্গো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উজ্জ্বল সাহা বলছেন, "আবহাওয়ার তারতম্যে এবার গাছে দুই পর্যায়ে মুকুল এসেছিল ৷ তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় ছিলাম ৷ বিষয়টি নিয়ে আমরা জেলা উদ্যানপালন দফতর, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথাও বলি ৷ তাঁদের নির্দেশিকা মেনে আমরা চাষ করতে থাকি ৷ এর সুফলও মেলে ৷ যেসব গাছে আগে মুকুল দেখা যায়নি, সেই গাছগুলিতেও ভালো মুকুল আসে ৷ দুই পর্যায়ে প্রচুর মুকুল এসেছিল ৷ আমাদের জেলায় সর্বাধিক পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ফলন হওয়া সম্ভব ৷"

    তিনি আরও বলেন, "গত বছর সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আম উৎপন্ন হয়েছিল ৷ আমাদের মনে হয়েছিল, এবার অন্তত চার লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন হবে ৷ কিন্তু গুটি হওয়ার পর সেই গুটি গাছ থেকে ঝরে পড়তে থাকে ৷ এখন কিছু পোকামাকড়ের উপদ্রব হয়েছে ৷ আমরা আধিকারিক ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছি ৷ তবে এবার গাছে যা আম আছে তাতে আমাদের অনুমান, খুব বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে এবার আমের ফলন তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন হতে পারে ৷ ইতিমধ্যে আম পাড়ার কাজ শুরু হয়েছে ৷ বিভিন্ন রাজ্য থেকে বরাতও আসতে শুরু করেছে ৷ আমরা আমচাষিদের অনুরোধ করেছি, কেউ যাতে পুষ্ট হওয়ার আগে গাছ থেকে আম না-পাড়েন কিংবা আম পাকানোর জন্য কার্বাইড প্রয়োগ না-করেন ৷"

    পোকামাকড়ের উপদ্রবে জেরবার

    পুরাতন মালদার আমচাষি বিবেক মণ্ডলের বক্তব্য, "এবার গাছে খুব ভালো মুকুল এসেছিল ৷ কিন্তু ফলন সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না ৷ এখনও গাছ থেকে আম পাড়া শুরু করিনি ৷ কারণ, পুষ্ট হওয়ার আগে আম পাড়লে তেমন দাম পাব না ৷ আম কম হওয়ায় দাম ভালো পেতেই হবে ৷ ইতিমধ্যে অসম থেকে পাইকার যোগাযোগ করে গিয়েছেন ৷ বাজার এখন ভালো আছে ৷ তবু আরও কয়েকটা দিন দেখতে চাই ৷ সামনের সপ্তাহ থেকে আম পাড়া শুরু করব ৷ কিছু গাছে শুলিপোকার উপদ্রব হয়েছে ৷ উদ্যানপালন বিভাগের পরামর্শে কীটনাশক স্প্রে করেছি ৷ তাতে কাজও হয়েছে ৷ আশা করছি, ফলন কম হলেও কিছু লাভের মুখ দেখতে পাব ৷"
  • Link to this news (eTV Bharat)