গাছের তলায় বসে প্রথমে পেট পুরে খেয়েছিল জঙ্গিরা, যেন কোনও তাড়াহুড়ো নেই। তার পরে M4 কারবাইন হাতে নিঃশব্দে লুকিয়ে পড়েছিল জঙ্গলের ভিতরে। ওত পেতে বসেছিল পর্যটকদের জন্য। ধরা পড়ার কোনও ভয়ই ছিল না তাদের। ২২ এপ্রিল পহেলগামের জঙ্গি হামলায় ধর্মীয় পরিচয় বেছে বেছে ২৬ জনকে খুনের আগে এ ভাবেই তৈরি হয়েছিল জঙ্গিরা। NIA-র বিশেষ আদালতে ১,৫৯৭ পাতার চার্জশিট জমা দিয়েছেন তদন্তকারীরা। সেখানেই উঠে এসেছে জঙ্গিদের লুকিয়ে থাকা, চলাফেরা, হামলার আগে খাওয়াদাওয়ার বিস্তারিত তথ্য।
চার্জশিট থেকে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন বৈসরনে ছিল তিন জন জঙ্গি। ফয়জল জাট ওরফে সুলেমান শাহ, হাবিব তাহির ওরফে জিবরান এবং হামজা আফগানি। ২১ এপ্রিল বৈসরনে পৌঁছয় তারা। রাতে ছিল স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ আহমেদের বাড়িতে। পারভেজ তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, বিকেলের দিকে তিন জনকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে যান তাঁর মামা বশির আহমেদ জোথার। পারভেজের মা দরজা খুলতেই জল চেয়েছিল তিন জঙ্গি। তার পরে ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ‘আল্লাহর পথে লড়াই করা মুজাহিদদের জল খাওয়ালে আশীর্বাদ মিলবে।’
চোস্ত উর্দুতে কথা বলছিল জঙ্গিরা। তবে পারভেজের দাবি, তাতে একটা পাঞ্জাবি টান ছিল। তাদের সঙ্গে ছিল একটা বড় ব্যাগ। বাড়িতে ঢুকেই ব্যাগটা লুকিয়ে রাখতে বলে তারা। পারভেজ তাই করেছিল। রাত ১০টা নাগাদ খেয়েদেয়ে চলে যায় তারা। যাওয়ার সময়ে এক তাড়া রুটি করে দিয়েছিল পারভেজের বাড়ির লোক। সেগুলি সঙ্গে নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তিন জন। পরে জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পারভেজ এবং তার মামাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
হামলার দিন সকালে বৈসরনে পৌঁছয় জঙ্গিরা। একটা গাছের নীচে বসে পেট পুরে খায়। তার পরে গায়ে মোটা কম্বল জড়িয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয় সেখানেই। কিছুক্ষণ পরে দুই জঙ্গি উপত্যকা রেইকি করতে যায়। তারা ফিরলে তিন জন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে রওনা দেয় চূড়ান্ত হামলা করতে। বেড়া টপকে পার্কে ঢোকে তারা। এক জঙ্গির মাথায় গো-প্রো ক্যামেরা বাঁধা ছিল।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ২টো বেজে ২৩ মিনিট। প্রথম গুলি চালায় এক জঙ্গি। তার হাতে ছিল কারবাইন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাকি দু’জন একে-৪৭ থেকে গুলি চালাতে শুরু করে। হামলার পরে পালানোর সময়েও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তিন পর্যটককে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে মারে। একেবারে শেষে পার্ক থেকে বেরনোর সময়ে শূন্যে গুলি চালিয়েছিল জঙ্গিরা। অনেকটা উল্লাসের ভঙ্গিতে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছিল তারা।
তিন জঙ্গিকেই অবশ্য খতম করে দিয়েছে ভারতীয় সেনা। চলতি বছরের শুরু হয় ‘অপারেশন মহাদেব’। তখনই শ্রীনগরের একটি জঙ্গলে তিন জনকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর জম্মুর বিশেষ এনআইএ আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছিল এনআইএ। তবে সেই সময়ে সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। আসলে তড়িঘড়ি করে সব সামনে আনলে তদন্তের সুতো ছিঁড়ে যেতে পারে, সতর্ক হয়ে যেতে পারে জড়িত চক্রও। তাই মাসের পর মাস ধরে সাক্ষ্য, ফরেন্সিক রিপোর্ট, ডিজিটাল প্রমাণ আর অসংখ্য লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ধীরে ধীরে জোড়া লাগে ঘটনার প্রতিটি খণ্ডচিত্র।