• ইদে কি কুরবানি হবে? পশুজবাই ঘিরে ঠিক যা যা চলছে বাংলায়
    আজ তক | ২২ মে ২০২৬
  • গোটা দেশের নজরে এখন পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলছে ইদে পশুজবাই বা কুরবানিকে ঘিরে। রাজ্য সরকারের কড়া নির্দেশিকায় মুসলিম ধর্মীয় নেতা বা রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

    ইদে কুরবানি নিয়ে ঠিক কী বলেছে রাজ্য সরকার?

    পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই ১৯৫০ সালের পশুহত্যা সংক্রান্ত আইন কার্যকর করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না। ১৪ বছর বয়স হয়নি, এমন গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। তা ছাড়াও মাংস কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দফতরের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। এর ফলে ইদে গরু জবাই নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে দাবি। ২০১৮ সালের অগাস্টে কলকাতা হাইকোর্টের একটি রায়ের উপর ভিত্তি করে ২০২২ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার ৷ সেই বিজ্ঞপ্তি এবং ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে গত ১৩ মে একটি নির্দেশিকা জারি করেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার৷ তবে এই নিয়মে কিছু বিশেষ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যদি পশুটি বার্ধক্যজনিত কারণে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, কোনও গুরুতর আঘাত পায়, শারীরিক বিকৃতির শিকার হয় অথবা এমন কোনও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে অক্ষম হয়ে পড়েছে, তবেই তাকে হত্যার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।

    এই মামলায় কী বলছে কলকাতা হাইকোর্ট?

    এই সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায় হল, হাইকোর্টের পূর্ববর্তী আদেশগুলি মেনেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, ২০১৮ সালের ডব্লিউপি ৩২৮ মামলার ক্ষেত্রে সমমর্যাদাসম্পন্ন একটি বেঞ্চ যে আদেশ দিয়েছিল, তা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। এমতাবস্থায়, ১৩ মে-র ওই জনবিজ্ঞপ্তিটি স্থগিত বা বাতিল করার কোনও ভিত্তি আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। সুতরাং, ১৩ মে-র ওই বিজ্ঞপ্তির প্রসঙ্গটি যতদূর জড়িত, ততদূর পর্যন্ত এই আবেদনগুলি খারিজ করা হল। কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, সুপ্রিম কোর্ট এর আগে রায় দিয়েছিল, গরু কুরবানি দেওয়া ইদ উল আজহার কোনও অপরিহার্য অংশ নয় এবং ইসলামের দৃষ্টিতেও এটি কোনও বাধ্যতামূলক ধর্মীয় প্রথা নয়।

    গরুর বয়স নিয়ে প্রশ্ন আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্যের

    হাইকোর্টে শুনানি চালকালীন  ‘জমিয়ত ই-উলেমা’র তরফে আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন গরুর গড় আয়ু নিয়ে। রাজ্যের নির্দেশিকা বলছে, ১৪ বছর বয়স হয়নি, এমন গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। বিকাশ সওয়াল করেন, কোনও আইন যদি দীর্ঘ দিন ধরে কার্যকর না করা হয়, তবে তার কার্যকারিতা নিজে থেকেই ক্ষীণ হয়ে যায়।  হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের ফলে গরুর হাট বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং দোকানপাট বন্ধের উপক্রম হওয়ায় এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষ তাঁদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় আচার পালন করতে না পেরে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই যুক্তি খারিজ করে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলে, এই আইনটি সমাজে কার্যকর ছিল বলেই তো তা নিয়ে এতগুলি মামলা দায়ের করার প্রয়োজন হল। তা ছাড়া প্রতি বছরই এই সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে এসেছে। ফলে আইনটি কার্যকর ছিল না, এমন দাবি করা ন্যায্য নয়।

    মুসলিম সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

    এই যাবতীয় বিতর্কের মধ্যেমুসলিম সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকির বক্তব্য, 'নির্দেশিকা মেনে গরু কুরবানি দেওয়া একটি কঠিন প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে। তাই কোনও রকম বিতর্ক বা সমস্যায় না জড়িয়ে এবং কুরবানির দিন যাতে কোনও বাধা বা অশান্তি তৈরি না হয়, সেই লক্ষ্যেই মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এ বছর গরু কুরবানি থেকে বিরত থাকার আবেদন জানাচ্ছি।' অন্যদিকে নাখোদা মসিজদের তরফে bangla.aajtak.in-কে জানানো হয়, রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা মেনেই তাঁরা চলবেন। নাখোদা মসজিদের মুখপাত্র নাসির ইব্রাহিম বলেন, 'আমরা আইন মেনে চলা নাগরিক। কেন আমরা আইন অমান্য করব? রাজ্যের সরকার যখন বলে দিয়েছে, প্রকাশ্য প্রাণী জবাই করা যাবে না, তখন বকরি ইদের দিনও তা হবে না। আর এমনটা তো করা উচিতও নয়। অন্য ধর্মের মানুষ পাশে থাকেন, তাঁদের তো অস্বস্তিও হতে পারে।' 

    হুমায়ুন, সিদ্দিকুল্লাহরা কী বলছেন?

    শুভেন্দু অধিকারীর সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য, 'কুরবানি কেউ আটকাতে পারবে না। যে কোনও মূল্যে কুরবানি হবে।' তাঁর কথায়, 'গরুর কুরবানি হবে, ছাগলেরও কুরবানি হবে, উটের কুরবানি হবে, যেসব পশু কুরবানির যোগ্য, সেই সব পশুর কুরবানি হবে, কেউ আটকাতে পারবে না। কুরবানি তো হবেই। কেউ বারণ করলে কান দেওয়া হবে না। ১৪০০ বছরের আগে থেকে কুরবানি পালন করা হচ্ছে। যতদিন এই দুনিয়া থাকবে,ততদিন কুরবানি চলবে।' 

    তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর দাবি, সরকার একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করে এমন নির্দেশিকা জারি করেছে। এর বিরোধিতা সর্বস্তরে হচ্ছে। তোষণের রাজনীতি হচ্ছে। সিদ্দিকুল্লাহ বলেন, 'কুরবানি নিয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অভিপ্রেত নয়। এই সিদ্ধান্ত সরকারের। তবে আমি সেই বিষয়ের থেকে ধর্মের উপরই বেশি জোর দিতে চাইছি। আমরা কুরবানি করব। কেউ আটকাতে পারবে না। উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে তো গরু খাওয়া হল। সেখানে অসুবিধে নেই। এখানে কেন? বাংলার অর্থনীতিও অনেকটা গরুর উপরই নির্ভরশীল।' 
  • Link to this news (আজ তক)