• শয্যাশায়ী স্ত্রী বোঝা! হাসপাতালে পড়ে ৪ বছর, বিল দেবেন না স্বামী, আদালতের নির্দেশে ঘরে ফিরলেন অবহেলিত বধূ
    প্রতিদিন | ২২ মে ২০২৬
  • দুর্ঘটনায় শয্যাশায়ী স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার স্বামীর। সাড়ে চার বছর ধরে হাসপাতালই হয়ে উঠেছিল আমহার্স্ট স্ট্রিটের পুনম গুপ্তের ঠিকানা। কলকাতা হাই কোর্টের হস্তক্ষেপে অবশেষে বাড়ি ফিরলেন বধূ। একজন স্বামী স্ত্রীর দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না, পর্যবেক্ষণ বিচারপতির।

    পুনম গুপ্ত এবং তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ কলকাতার বাসিন্দা। পুনম গৃহবধূ। জয়প্রকাশ লোহার ছাঁট কারবারি। বেশ কয়েক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে স্কুটি চড়ে যাচ্ছিলেন। আমহার্স্ট স্ট্রিটে দুর্ঘটনায় স্কুটি থেকে ছিটকে পড়ে যান পুনম। মাথায় গভীর চোট পান। ভর্তি করা হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। সেখান থেকে বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় তাঁকে। তাতেও লাভ কিছু হয়নি। কথা বলা কিংবা চলাফেরার ক্ষমতা হারান বধূ। তবে হাসপাতাল সূত্রে খবর, তিনি ইশারায় সাড়া দেন। নিজে খাওয়াদাওয়াও করতে পারেন। তাই চাইলে তাঁকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।

    তবে বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাঁকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাননি স্বামী। এমনকী হাসপাতালে বিল মেটানোও একসময় পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ বিল বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা। হাসপাতাল কর্তপক্ষের দাবি, বিমা সংস্থা দিয়েছে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। আর রোগীর পরিবারের তরফে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জয়প্রকাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। তাতেও কোনও লাভ হয়নি। মাঝে বছর দুয়েক সময় কেটে যায়। ২০২৪ সালের ১০ মে বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিকাল এসট্যাবলিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশনের দ্বারস্থ হয় রোগীর পরিবার। কমিশনের তরফে নোটিস পাঠানো হয় জয়প্রকাশকে। যদিও লাভ হয়নি কিছুই।

    এরপর কমিশনের পরামর্শমতো কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। জয়প্রকাশ আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেন, তাঁর পক্ষে জীবন্মৃত স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে দেখভাল করা সম্ভবপর নয়। কোনও সরকারি হাসপাতাল কিংবা হোমে পাঠিয়ে দেওয়ার আর্জি জানান। এরপর বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। রোগীর শারীরিক অবস্থা খতিয়ে দেখার পর পুনমকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, আইনত বৈধ স্ত্রীর দায়িত্ব থেকে কখনই পিঠটান দিতে পারেন না স্বামী। স্ত্রীর দায়িত্ব তিনি কখনই অস্বীকার করতে পারেন না। পুনমের ১৭ বছর বয়সি এক সন্তান রয়েছে। মাকে অন্যত্র পাঠালে সেই সন্তান মায়ের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবে।

    আদালতের তরফে সাফ জানানো হয়, বিশেষ শারীরিক ক্ষমতাসম্পন্ন এবং মানসিকভাবে অসুস্থদের হোমে পাঠানো হয়। সকলকে নয়। যদি হোমে পুনমকে পাঠানো হয়, তাহলে প্রমাণিত হবে যে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন অসুস্থ হলেই তাঁকে পরিত্যাগ করা সম্ভব। আর  সরকারকে সেই ব্যক্তিকে হোমে পাঠাতে হবে। এটা সম্ভব নয়। সরকারের নির্দিষ্ট নীতি না থাকলে অযথা চাপ বাড়বে বলেই পর্যবেক্ষণ আদালতের। হাই কোর্টের নির্দেশমতো সাড়ে চার বছর পর বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি ফিরলেন পুনম গুপ্ত। বিল মকুব করে দিয়েছে আদালত।
  • Link to this news (প্রতিদিন)