• NCERT বই বিতর্কে নয়া মোড়, তিন শিক্ষাবিদকে ব্যান করার নির্দেশ প্রত্যাহার সুপ্রিম কোর্টের
    এই সময় | ২২ মে ২০২৬
  • NCERT (National Council of Educational Research and Training)-এর অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ‘বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতি’ চ্যাপ্টার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে বড়সড় অবস্থান বদল করল শীর্ষ আদালত। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট তাদের আগের নির্দেশে থাকা কড়া মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং তিন শিক্ষাবিদকে ব্যানের নির্দেশও তুলে নিল আদালত। সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের থেকে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার ১১ মার্চের আদেশটিও সংশোধন করেছে কোর্ট।

    ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ শিক্ষাবিদ মিশেল দানিনো, সুপর্ণা দিওয়াকর এবং অলোকপ্রসন্ন কুমারের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছে যে, বিচার বিভাগকে নেতিবাচক ভাবে দেখানোর বা খাটো করার কোনও উদ্দেশ্য তাঁদের ছিল না এবং পাঠ্যপুস্তকটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছিল। আদালতও মেনে নেয় যে বই তৈরির দায় শুধুমাত্র তিনজনের উপর চাপানো ঠিক হবে না।

    NCERT-র অষ্টম শ্রেণির সমাজ বিজ্ঞানের বইয়ের একটি অধ্যায়কে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, বিচার বিভাগের নানা স্তরে রয়েছে দুর্নীতি। সেই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন খোদ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।

    রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ বিচারব্যবস্থা। প্রসঙ্গত, NCERT-র অষ্টম শ্রেণির সমাজ বিজ্ঞানের বইতে বিচার বিভাগের ভূমিকা বর্ণনার অধ্যায়ে জুডিশিয়াল সিস্টেমের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, রায়দানে দেরি হওয়া-সহ একাধিক বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছিল। বিচারকের অভাব এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়া-সহ বিচার কাঠামোয় একাধিক বাধার কথাও বলা হয়েছিল।

    এর পরেই গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি গ্রহণ করে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছিলেন যে বিচারব্যবস্থাকে ‘কলঙ্কিত’ করার চেষ্টা করা হয়েছে। মার্চ মাসে আদালত কেন্দ্র, রাজ্য এবং বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয় যাতে তিন শিক্ষাবিদ— মিশেল দানিনো, সুপর্ণা দিওয়াকর এবং অলোক প্রসন্ন কুমারের সঙ্গে সমস্ত অ্যাকাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়।

    সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, আগের নির্দেশের সেই অংশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে ওই তিনজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালত বলেছে, এখন কেন্দ্র বা রাজ্য চাইলে স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তবে আদালতের আগের পর্যবেক্ষণের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া চলবে না।

    আদালত আগের সেই মন্তব্যও তুলে নিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল শিক্ষাবিদরা ইচ্ছাকৃত ভাবে বিচারব্যবস্থাকে নেতিবাচক ভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বেঞ্চ জানায়, ওই সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য আর বহাল থাকছে না।

    শুনানির সময়ে তিন শিক্ষাবিদের আইনজীবীরা বলেন, ‘আদালতের আগের মন্তব্যের ফলে তাঁদের পেশাগত সুনাম মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ বিশেষ করে মাইকেল দানিনোর আইনজীবী জানান, তিনি আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিত শিক্ষাবিদ এবং তাঁর কথা না শুনেই এমন পর্যবেক্ষণ তৈরি করা হয়েছিল। তবে, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে তাদের উদ্বেগ পাঠ্যপুস্তকটির বিষয়বস্তু নিয়ে এবং অধ্যায়টিতে বিচার বিভাগের ভূমিকা বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে।

    অন্য দিকে, সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে জানান, কেন্দ্র ইতিমধ্যেই ওই সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি ‘collective effort’ তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং দাবি করেন, পুরো খসড়া পাঠ্যক্রম সব সদস্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়নি।

    এই বিতর্কের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক মার্চ মাসে প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বে একটি ওভারসাইট কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিতে প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপালও রয়েছেন। তাদের কাজ হলো বিতর্কিত অধ্যায় পুনর্বিবেচনা করা এবং সংশোধনের সুপারিশ করা।

    একইসঙ্গে NCERT তাদের National Syllabus and Teaching Learning Material Committee-ও পুনর্গঠন করে। নতুন কমিটির নেতৃত্বে আনা হয় প্রাক্তন উপাচার্য এম সি পন্থকে এবং সহ-সভাপতি করা হয় আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ মঞ্জুল ভার্গবকে।

    তবে সুপ্রিম কোর্ট এদিনও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তাদের আপত্তি ছিল মূলত পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে, ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিচারব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি। তাদের মতে, ওই অধ্যায়ে বিচারব্যবস্থার ইতিবাচক ভূমিকা— যেমন সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষা, গরিবদের আইনি সহায়তা এবং বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোর মতো বিষয় যথেষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।

  • Link to this news (এই সময়)