• পড়ুয়াদের পিঠের বোঝা কমাচ্ছে রাজ্য, স্কুল ব্যাগের ওজন নিয়ে কড়া নির্দেশিকা শিক্ষা দফতরের
    eTV Bharat | ২২ মে ২০২৬
  • কলকাতা, 22 মে: প্রতিদিন পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার দিন এবার শেষ। ছোট ছোট পড়ুয়াদের ঘাড় ও পিঠের ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের 'স্কুল ব্যাগ নীতি 2020' মেনে রাজ্যের সমস্ত স্কুলে ব্যাগের ওজন কমানোর নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কুল শিক্ষা দফতরের অন্তর্গত 'পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন'।

    নয়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনোভাবেই ছাত্রছাত্রীদের ব্যাগের ওজন তাদের নিজেদের শরীরের ওজনের 10 শতাংশের বেশি হতে পারবে না। রাজ্যের সমস্ত জেলা শিক্ষা আধিকারিক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শকদের এই নিয়ম কড়াকড়িভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

    চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত ভারী ব্যাগ বইলে শিশুদের পেশিতে টান ধরে, মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয় এবং হাঁটাচলার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেই শারীরিক কষ্ট দূর করতেই নয়া নির্দেশিকায় ব্যাগের ওজনের একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য কোনও স্কুল ব্যাগ থাকবে না। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যাগের ওজন হবে 1.6 থেকে 2.2 কেজির মধ্যে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে তা 1.7 থেকে 2.5 কেজি।



    ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির জন্য 2 থেকে 3 কেজি, অষ্টম শ্রেণির জন্য 2.5 থেকে 4 কেজি এবং নবম-দশম শ্রেণির ব্যাগের ওজন 2.5 থেকে 4.5 কেজির মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ব্যাগের ওজন কোনোভাবেই 5 কেজির বেশি হতে পারবে না। নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রতিটি স্কুলকে এই ওজনের তালিকা তাদের নোটিশ বোর্ডে ও ক্লাসরুমে টাঙাতে হবে। পাশপাশি, ওজন মাপার জন্য স্কুল চত্বরে নিয়মিত ওয়েইং মেশিনের ব্যবহারও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।



    ব্যাগের ওজন কমাতে পাঠ্যবই এবং খাতার ব্যবহারেও বড়সড় বদল আনা হচ্ছে। শিক্ষা দফতরের নির্দেশ, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য কেবল একটিমাত্র ক্লাসওয়ার্ক খাতা থাকবে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে থাকবে দু’টি খাতা, যার মধ্যে একটি স্কুলেই রেখে যাওয়া যাবে। উঁচু ক্লাসের ক্ষেত্রে মোটা বাঁধানো খাতার বদলে পাতলা খাতা ব্যবহার করতে হবে। রুটিনের ক্ষেত্রেও বদল আনার কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিকে দিনে মাত্র দু’টি বিষয় পড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই বিষয়ের পরপর দু’টি ক্লাস বা 'ব্লক পিরিয়ড' রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে পড়ুয়াদের অতিরিক্ত বই বইতে না হয়। এছাড়া বেঞ্চে পাশাপাশি বসা সহপাঠীদের মধ্যে বই শেয়ার করার অভ্যাসকেও উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে চাকাযুক্ত ব্যাগ বা ট্রলি ব্যাগ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।



    ​খাতা-বইয়ের পাশাপাশি জলের বোতল এবং টিফিন বক্সের ওজনেও রাশ টানতে চাইছে প্রশাসন। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্কুলগুলিতে পরিস্রুত পানীয় জল এবং উন্নত মানের মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বাড়ি থেকে বোতল বা টিফিন বক্স বয়ে আনার কোনও প্রয়োজনই না থাকে। অন্যদিকে, পড়ুয়াদের মানসিক চাপ কমাতে হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজের ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম চালু হচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোনও হোমওয়ার্ক দেওয়াই চলবে না। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য সপ্তাহে সর্বাধিক দু'ঘণ্টা এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য দিনে মাত্র এক ঘণ্টার হোমওয়ার্ক দেওয়া যাবে। উঁচু ক্লাসের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রেও দিনে দু'ঘণ্টার বেশি বাড়ির কাজ দেওয়া যাবে না। হোমওয়ার্ক যেন সৃজনশীল হয় এবং যান্ত্রিকভাবে মুখস্থ করার প্রবণতা না থাকে, সেদিকে শিক্ষকদের কড়া নজর দিতে বলা হয়েছে।

    জাতীয় শিক্ষানীতি 2020-এর অনুকরণে 'ব্যাগহীন দিন' বা 'ব্যাগলেস ডে' পালনেও জোর দেওয়া হয়েছে রাজ্যের এই নতুন নির্দেশিকায়। বছরে বেশ কয়েকদিন পড়ুয়ারা কোনও ব্যাগ ছাড়াই স্কুলে যাবে এবং কুইজ, খেলাধুলা, শিল্পকলা বা শিক্ষামূলক ভ্রমণে অংশ নেবে। বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য 10 দিনের একটি ইন্টার্নশিপের কথা বলা হয়েছে, যেখানে তারা স্থানীয় কারিগরদের কাছ থেকে নানা ধরনের বৃত্তিমূলক কাজ শিখতে পারবে।

    অন্যদিকে, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সুবিধার জন্য স্কুলের বুক ব্যাঙ্ক থেকে অতিরিক্ত এক সেট বই দেওয়া এবং স্কুলে লকারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। গোটা প্রক্রিয়ায় সচেতনতা বাড়াতে পেরেন্টস-টিচার মিটিংয়ে নিয়মিত আলোচনার নির্দেশ দিয়েছে স্কুল শিক্ষা দফতর। রাজ্যের এই কড়া পদক্ষেপের ফলে পড়ুয়াদের স্কুলজীবন অনেকটাই চাপমুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করছে শিক্ষামহল।
  • Link to this news (eTV Bharat)