মণিপুষ্পক সেনগুপ্ত
যেমন গর্জন, তেমনই বর্ষণ!
গত দশদিনে শো–কজ় চিঠি পেয়েছেন বিজেপির পঞ্চাশেরও বেশি নেতা। তাঁদের সবার বিরুদ্ধেই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁরা কেউ ৪ মের পরে তৃণমূলের পার্টি অফিস দখল করতে ছুটেছিলন, কেউ আবার সরকারি অফিসে চড়াও হয়ে আধিকারিকদের ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে এসেছেন। বিজেপির মতো রেজিমেন্টেড দলে শৃঙ্খলার প্রশ্নে কাউকে দল থেকে সাসপেন্ড করা অথবা শো–কজ় করা নতুন কিছু নয়। তবে দশ দিনের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের পঞ্চাশ জন নেতাকে শো–কজ় করা বিজেপির ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
৪ মে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের দিনই বিজেপির সর্বস্তরের নেতা–কর্মীকে সংযত থাকার বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দিল্লি থেকে ওই দিন রাতেই তিনি বলেছিলেন, ‘বদলা নয়, বদল হবে।’ বাংলার বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল, ‘সন্ত্রাসের জবাব পাল্টা সন্ত্রাস হতে পারে না। হিংসা ভুলে এখন বাংলার সার্বিক উন্নয়নে সবাইকে ঝাঁপাতে হবে। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও করতে হবে।’ কারণ, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তখন তৃণমূলের পার্টি অফিস দখল হওয়ার খবর সামনে আসতে শুরু করেছে। বেশ কিছু জেলায় তৃণমূল নেতাদের উপরে হামলার ঘটনা নিয়েও হইচই শুরু হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। প্রতিহিংসার আগুন নেভাতে তাই মাঠে নামেন বিজেপির শীর্ষ নেতা–নেত্রীরা। সব জেলার সভাপতিকে ফোন করে শমীক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, বিজেপির তৃণমূলীকরণ তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না। তাঁর কড়া বার্তা ছিল, মাথায় গেরুয়া তিলক কেটে হাতে পদ্ম ঝান্ডা নিয়ে যাঁরা তৃণমূলের পার্টি অফিস দখল করছেন, তাঁরা বিজেপির কেউ নন। দলের কেউ জবরদখলের রাজনীতি করলে তাঁকে বিজেপি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও গর্জন ছাড়েন শমীক।
সেটা যে নিছক গর্জন ছিল না, সেটা গত দশদিনে বিলক্ষণ টের পেয়েছেন বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতা–কর্মীরা। কারণ, যাঁরা শমীকের এই গর্জন থেকে বর্ষণ হবে না ভেবেছিলেন, তাঁরা অনেকেই পার্টির নিষেধ অমান্য করে তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েত, সমবায়, বিভিন্ন ইউনিয়ন জোর করে দখল করতে গিয়েছিলেন। তাঁরা বোধহয় কল্পনাও করতে পারেননি যে, জেলাস্তরের প্রতিটি বিজেপি নেতা–কর্মীদের গতিবিধির খবর রাজ্য সভাপতি শমীকের কাছে বিভিন্ন সূত্র মারফত পৌঁছে যাচ্ছে। তাই গত ৪ মে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে বিজেপির কোন নেতা কোথায় নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করে ‘আধিপত্যবাদ’ কায়েম করতে গিয়েছেন, তার খুঁটিনাটির হদিশ ছিল শমীকের কাছে। যদিও বিজেপির একাংশের মনে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করবেন না শমীক। কিন্তু দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়ে শমীক বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি নিছক গর্জন করার জন্য বিজেপির রাজ্য সভাপতির চেয়ারে বসেননি। তাঁর নির্দেশে বিজেপির শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির প্রধান প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও পর্যন্ত পঞ্চাশ জনের বেশি বিজেপি নেতা–কর্মীকে শো–কজ়ের চিঠি ধরিয়েছেন। বিজেপির এক বর্ষীয়ান নেতার কথায়, ‘কমবেশি সব জেলা থেকেই অভিযোগ আসছে। আমাদের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি প্রত্যেকটি অভিযোগই খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছে। তবে উত্তরের চেয়ে দক্ষিণবঙ্গ থেকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ বেশি আসছে।’ তাঁর দাবি, যাঁদের শো–কজ় নোটিশ ধারানো হয়েছে, তাঁদের মধ্যে তিন জনকে ইতিমধ্যেই সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাদের মারধর এবং পার্টি অফিস জবরদখলের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন বিজেপির ওই শীর্ষ নেতা।
বিজেপি এখন রাজ্যের শাসকদল। ফলে নানা রকম কায়েমি স্বার্থের লোভে বিভিন্ন দল থেকে অনেকেই যে বিজেপিতে ভিড়তে চাইবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁদের একাংশ যে বিভিন্ন নেতা–নেত্রীকে ধরে শেষ পর্যন্ত পদ্মে নাম লিখিয়ে নেবেন, সেটাও অজানা নয় শমীক ভট্টাচার্যদের। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাই ক্ষমতার চেয়ারে বসার শুরু থেকেই ‘শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া’ চালু রাখতে চাইছেন শমীক। এক প্রবীণ বিজেপি নেতার ব্যাখ্যা, ‘১২ মের পর থেকে শো–কজ় চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছে। যাঁরা চিঠি পাচ্ছেন, তাঁদের উপরে তো শৃঙ্খলাভঙ্গের খাঁড়া নামছেই, সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে দল বিরোধী কাজ করার আগে দশবার ভাববেন পার্টির নেতা–কর্মীরা। বেনোজল বরদাস্ত করবে না পার্টি। দলের শুদ্ধকরণ অভিযান একটি বহমান প্রক্রিয়া।’