• ফাটল তৃণমূলের পুর-দলেও! মমতার বৈঠক এড়ালেন অনেক কাউন্সিলারই
    এই সময় | ২৩ মে ২০২৬
  • এই সময়: বিধানসভার ফল প্রকাশের পরে বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে রাজ্যের কোনও পুরসভায় মেয়াদ শেষের আগে হস্তক্ষেপ করা হবে না। কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে শাসকদল সেই স্ট্যান্ড নিলেও তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলারদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে শুক্রবার কলকাতা পুরসভায় যে বেনজির ঘটনা ঘটেছে তা জোড়াফুল শিবিরে ফাটলের দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। বর্তমানে কলকাতা পুরসভায় ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে রয়েছে ১৩৬টি ওয়ার্ড। বাকিগুলির মধ্যে রাজ্যের শাসকদল বিজেপির হাতে রয়েছে চারটি। অথচ এ দিন পুরসভার মাসিক অধিবেশন এবং পরে মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে তৃণমূলের হেভিওয়েট কাউন্সিলারদের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে–– দলের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব রয়েছে। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিকেলে কালীঘাটে বৈঠক ডাকা সত্ত্বেও তারক সিং, অনিন্দ্য রাউত, জুঁই বিশ্বাস, সুদর্শনা মুখোপাধ্যায়, বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত, জীবন সাহা সহ একাধিক হেভিওয়েট কাউন্সিলারকে সেখানে দেখা যায়নি।

    এর আগে শুক্রবার দুপুরে কলকাতা পুরসভার মাসিক অধিবেশনকে ঘিরে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রাক্তন পুর সচিব স্বপন কুমার কুণ্ডুর তরফে অধিবেশন স্থগিতের কথা বৃহস্পতিবারই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তৃণমূলের তরফে এ দিন অভিযোগ তোলা হয়, পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডের নির্দেশে এই কাজ হয়েছে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চেয়ার পার্সন মালা রায়ের অফিস থেকে তৃণমূলের কাউন্সিলারদের শুক্রবার বেলা দেড়টার মধ্যে পুরসভায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ দিন বেলা একটা নাগাদ মালা পুরসভায় ঢোকার পরে দেখা যায়, অধিবেশন কক্ষ বা কাউন্সিল চেম্বার্সে তালা ঝুলছে। মিনিট দশেক পরে ১৬ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান সুদীপ পোল্লে এবং কালীঘাটের ৮৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার প্রবীরকুমার মুখোপাধ্যায় নতুন পুর সচিব কিশোর বিশ্বাসের ঘরে ঢোকেন। পুর সচিব তাঁদের বলেন, ‘আমি এখনও চার্জ নিইনি। তাই কাউন্সিল চেম্বার্সের তালা খুলতে পারব না।’

    এরপর মালা দলের কাউন্সিলারদের নিয়ে বিকল্প অধিবেশন শুরু করেন লাগোয়া কাউন্সিলার ক্লাবে। তিনি বলেন,‘পুরসভায় অধিবেশন ডাকা, স্থগিত করা এবং অধিবেশন সংক্রান্ত যাবতীয় অধিকার চেয়ার পার্সনের। পুর সচিব স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউন্সিল চেম্বার্সের দরজা খুলতে দেননি।’ এ দিন বিকল্প অধিবেশনে একটি মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপন করে তার উপরে আলোচনা করেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম, ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ, আইন বিভাগের মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার বিশ্বরূপ দে। প্রয়োজনে কমিশনারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পরামর্শ দেন তাঁরা। তবে এ দিনের বিকল্প অধিবেশনে দেখা যায়নি নিকাশি বিভাগের মেয়র পারিষদ তারক সিং, উদ্যান বিভাগের মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার, পুরসভায় তৃণমূলের চিফ হুইপ বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত, বরো নয়ের চেয়ারপার্সন দেবলীনা বিশ্বাস, দশ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সন জুঁই বিশ্বাস, বারো নম্বর বরোর চেয়ারম্যান সুশান্ত ঘোষ সহ আরও অনেককে। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরসভায় তৃণমূলের ১৩৬ জন কাউন্সিলারের মধ্যে ৯৬ জন অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। যদিও বিকেলে কালীঘাটের বৈঠকে দেবাশিস কুমার, সুশান্ত ঘোষদের দেখা গেলেও বাপ্পাদিত্য, দেবলীনা, জুঁই, তারক সিংয়ের মতো হেভিওয়েট মুখের দেখা মেলেনি। পুরসভার বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, তাঁদের অধিবেশনেই ডাকা হয়নি। জবাবে চেয়ার পার্সন মালা রায় বলেন, ‘আমি শুধু দলের কাউন্সিলারদের আসতে বলেছি।’ বিজেপির সজল ঘোষ পাল্টা বলেন,‘এই অধিবেশন বেআইনি। রাজ্যের মতো পুরসভাতেও ক্ষমতা হারাবে তৃণমূল।’ অন্যদিকে, ৯২ নম্বর ওয়ার্ডের সিপিআই কাউন্সিলার মধুছন্দা দেব বলেন,‘আমি দীর্ঘ দিনের কাউন্সিলার, এই তামাশা কোনওদিন দেখিনি।’ এ দিন বিকল্প অধিবেশন প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন,‘তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ওরা নিজেরাই তালা ঝুলিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ওয়েব সাইট থেকে ফিরহাদ হাকিমের ছবিও সরিয়ে দিয়েছে। কে একজন পদত্যাগ করেছে শুনে ফিরহাদ বলছেন, তিনিও পদত্যাগ করবেন। আবার কখনও বলছেন, সামনে বর্ষা তাই পদত্যাগ করবেন না। এ সব ওদের গন্ডগোল। বিজেপির তালা ঝোলানোর প্রয়োজন নেই। সময় মতো পুরভোট হবে। মানুষ যেভাবে রাজ্য থেকে তৃণমূলকে সরিয়ে দিয়েছেন, সে ভাবেই পুরসভা থেকে সরিয়ে দেবেন।’ মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন,‘রাজ্যে নতুন সরকার ভোটে জিতে এসেছে। কলকাতার পুর বোর্ডও নির্বাচিত। একটি নির্বাচিত পুর বোর্ডের উপরে এই ধরনের স্বৈরাচারী আক্রমণ করা যায় না। বাস্তব হলো এটাই, তারপরেও অন্যায় করা হচ্ছে। এখন শহরে বড় কোনও বিপর্যয় হলে সেই দায় কে নেবে? সামাল তো দিতে হবে নির্বাচিত পুর বোর্ডকেই।’

    বিকেলে কালীঘাটে উপস্থিত ১০৪ জন কাউন্সিলারদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘পুর প্রশাসনের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহ থেকে পুরসভায় কাউন্সিলারদের ধর্নায় বসতে হবে। কাউন্সিলারদের রাস্তায় নেমে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে পুর প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ কী ভাবে নেওয়া যায় তা নিয়েও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ এ দিন বিপুল সংখ্যক কাউন্সিলারদের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে এন্টালির বিধায়ক তথা কলকাতা পুরসভার শিক্ষা বিভাগের মেয়র পারিষদ সন্দীপন সাহা বলেন,‘কে কোথায় উপস্থিত থাকবেন সেটা তাঁর ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। এ নিয়ে কিছু বলার নেই। দলনেত্রী সবাইকে বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে নামার নির্দেশ দিয়েছেন।’

  • Link to this news (এই সময়)