একসময় কাঁপিয়েছেন যাত্রার মঞ্চ, দাঁতনের প্রধান শিক্ষকের কলমে এখন শুধুই গল্প-কবিতা
News18 বাংলা | ২৩ মে ২০২৬
এখনও গলায় তাঁর সেই দরাজ জোর। যে কোনও চরিত্রে অভিনয় করে অনায়াসেই মুগ্ধ করে দিতে পারেন অগণিত দর্শককে। তবে সময়ের অভাবে এবং ব্যস্ততার কারণে এখন আর আগের মত যাত্রার মঞ্চে ওঠা হয় না। লেখা হয় না যাত্রার সংলাপও। তবুও তাঁর কলম থেমে থাকেনি। যাত্রাপালার বদলে এখন তিনি নিয়মিত লিখছেন প্রবন্ধ, গল্প কিংবা কবিতা। তিনি পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন থানার গণপাদা এলাকার বাসিন্দা সুকুমার শাসমল।
বর্তমানে তিনি মনোহরপুর রাজা রামচন্দ্র বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক। একটা সময় ছিল যখন এই প্রধান শিক্ষকের অন্যতম কাজ ছিল যাত্রার সংলাপ লেখা এবং যাত্রা দলে অভিনয় করে রোজগার করা। কয়েক দশক আগে যখন মানুষের আনন্দ বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল যাত্রা, তখন শুধুমাত্র কলকাতার দল নয়, স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হত আঞ্চলিক যাত্রা দল।
সুকুমারবাবু স্নাতক হওয়ার পর থেকেই অভিনয়ের পাশাপাশি যাত্রা পালা লেখা শুরু করেন। সেই লেখা নিয়ে বিভিন্ন দলের কাছে ছুটে যেতেন তিনি। ১৯৮৭ সাল থেকে এই যাত্রার সংলাপ লেখা শুরু তাঁর। এর নেপথ্যে ছিল এক বিশেষ ভাবনা। যাত্রাদলে এমন কিছু চরিত্র থাকত, যারা সামান্য অভিনয়ের পর মঞ্চ থেকে হারিয়ে যেত এবং উপেক্ষিত থেকে যেত। সেই উপেক্ষিত চরিত্রগুলি বাদ দিয়ে যাতে সবাই প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পায়, সেই ভাবনা থেকেই তিনি কলম ধরেন।
নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি লিখেছেন প্রায় ১৭টি সামাজিক যাত্রাপালা। সেগুলি পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর থেকে শুরু করে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের একাধিক জায়গায় পরিবেশিত হয়েছে এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেই সময় প্রিন্টার বা জেরক্স মেশিন না থাকায় সমস্ত সংলাপ নিজের হাতেই লিখতেন তিনি। সেই হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিগুলি আজও সযত্নে গুছিয়ে রেখেছেন তিনি, যা হয়ত আগামী দিনে এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে। শিল্পের প্রতি তাঁর এই অটুট ভালোবাসা আজও অমলিন।
সুকুমারবাবুর এই পথচলা শুরু হয়েছিল অ্যামেচার যাত্রা দিয়ে। পরে প্রায় তিন বছর পেশাদার যাত্রা দলেও দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার পর সময়ের অভাবে যাত্রা দল এবং সংলাপ লেখা ছাড়তে হয় তাঁকে। কর্মজীবনের শুরুতে পূর্ব মেদিনীপুরে চাকরি পেলেও পরে বদলি হয়ে আসেন পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের মনোহরপুরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রার কদরও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এখন আর আগের মত যাত্রার সংলাপ লেখা হয় না। তবে তাঁর সেই শিল্পসত্তা আজও বেঁচে রয়েছে প্রবন্ধ, ছোটগল্প এবং কবিতার মধ্যে দিয়ে।
প্রায় ৩০ বছর আগের সেই হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি আর তাঁর দরাজ গলার স্বর আজও মনে করিয়ে দেয় সোনালি অতীতের কথা। শিক্ষাদানের পাশাপাশি একজন প্রধান শিক্ষকের এই অপরিসীম শিল্পগুণ ও সংস্কৃতিপ্রেম সত্যিই অবাক করেছে সকলকেই।