মুম্বই গিয়ে শুনতে হয়, কী নিম্ন মানের বাংলা ছবি! এই ধারণাটা বদলাক: রাইমা
প্রতিদিন | ২৩ মে ২০২৬
বাইরে গনগনে রোদ্দুর। সমুদ্র নীল শার্ট আর জিন্সে ধরা দিলেন ফুরফুরে অভিনেত্রী। অনেকদিন পর বাংলা ছবিতে রাইমা সেন। দারুণ এনজয় করছেন 'সিঙ্গলহুড'। আসন্ন সিনেমা 'ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড' ইন্ডাস্ট্রি, পালাবদল, সব কিছু নিয়ে অকপট রাইমা সেন। বললেন, 'আমি মিটিং-মিছিলে যাই না, স্ট্রাইকে নেই! ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গোল্লায় গিয়েছে', কেন?
শম্পালী মৌলিক
মে ২২, ২০২৬
প্রথমবার উইন্ডোজ-এর সঙ্গে কাজ করলেন ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ ছবিতে। কেমন লাগল?
– শিবু আর নন্দিতাদিকে বললাম, ২৫ বছর পর আমার কথা ভাবলে! ওরা বলল, ‘এটা রাজ পরিবারের গল্প, তোমাকে ছাড়া হবে না।’ আমি কখনও ওদের সঙ্গে কাজ করিনি, খুব ভালো লাগল। ওদের ব্যবহার খুব ভালো, বেশ যত্ন করেছে, কোনও সমস্যা হয়নি। অনেকটা আউটডোর শুটিং করলাম। খুব আনন্দ হল, সব অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করে। ওদের সঙ্গে আবার কাজ করতে চাই। প্রায় তিন-চার বছর পর বাংলা ছবি করলাম। অনেক বছর ভালো সিনেমার অফারই পাইনি।
সে জন্য খারাপ লাগা তো ছিলই?
– নিশ্চয়ই। ভাবছিলাম কী হল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির। এত ভালো ভালো সব পরিচালকেরা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আগে আমি কাজ করেছি। ওঁরা তো প্রায় সবাই বাড়িতে বসে। আমার কাছে বিগত চার-পাঁচ বছরে সেরকম কিছু আসছিল না। সৌভাগ্যবশত, আমি বম্বেতে কাজ করছি। আমার সেরকম সমস্যা হয়নি ঠিকই, কিন্তু ভাবছিলাম সেই সব পরিচালকরা কোথায়?
কেন অফার আসছিল না মনে হয়?
– তখন ভাবছিলাম, আমার জন্য তেমন কোনও কাজ নেই হয়তো। যখনই আমি কোনও পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতাম, শুনতাম– ‘ও, একটা ভালো কিছু হলে তোমার কথা ভাবব।’ মনে হত, যে আমার জন্য হয়তো রোল নেই। তার পরে আমি এই ছবিটা করলাম। তার মানে সবার জন্য রোল আছে ইন্ডাস্ট্রিতে। আমি কখনও অতটা ভিতরে গিয়ে দেখিনি। কোনও মিটিং-মিছিলে যাই না, স্ট্রাইকে নেই কিন্তু যা শুনছি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গোল্লায় গিয়েছে। অনেকেই বলত, বাংলা সিনেমা ক্রমশ নিম্নমানের হয়ে যাচ্ছে। মিডিওক্রিটি ওয়াজ সেলিং হিয়ার। ভালো ভালো পরিচালকরা বসে আছেন। ওয়ান ফিল্ম ওয়ান্ডার, ফিল্ম মেকিং জানে না, ওরাই বড় বড় সিনেমা করছে। আশা করি সেই সব বদলাবে। সব ভালো ডিরেক্টর যাঁরা বাড়িতে বসে আছেন তাঁরা আবার ছবি করতে পারবেন। ভালো অভিনেতারা আবার ফ্লোরে আসবেন। পাঁচ-ছ’বছর কী হয়েছিল জানি না।
মাঝের সময় আপনি বিবেক অগ্নিহোত্রীর সঙ্গে ‘দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার’ করেছেন।
– বাধ্য হয়ে করেছি। কোনও কাজই তো পাচ্ছিলাম না।
ওটা কি আপনার এখানে কাজ না পাওয়ার কারণ হতে পারে?
– না, না, ওটা ২০২৩ সালের ছবি। আমি গত পাঁচ ছ’বছর ধরে বাংলা ছবিতে কাজ পাইনি। ওই ছবিটা কোনও ফ্যাক্টর না।
এই ‘ফুলপিসি এডওয়ার্ড’-এর রাজপরিবারে আপনি মেজো বউ।
– শিবু আমাকে বলল, এটা রয়্যাল ফ্যামিলি তোমাকে দরকার। তারপর যখন ওয়ার্কশপ করতে এলাম, শিবু আমাকে দিয়ে কত কাজ করাল। আমি তো জানতাম না, এইরকম রাজ পরিবার! ভেবেছিলাম হয়তো রিল্যাক্স করব। ‘তুমি তো আমাকে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিলে, তুমি আমাকে চিট করলে’, বলেছিলাম শিবুকে। রান্নাবান্না, ঘরের কাজ সব করিয়ে নিয়েছে। আমাকে ঠকিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম ‘যোধা আকবর’ টাইপ হবে, সেইখানে আমি রান্না-টান্না সব করেছি (হাসি)।
চরিত্রটা কেমন?
– এখন আমি একটু ইন্টারেস্টিং কিছু খুঁজছি। আমার ‘অদিতি’ চরিত্রটা খুবই ইন্টারেস্টিং। সংলাপগুলো শুনলেই বুঝতে পারবে। স্ট্রং ক্যারেক্টার, বাকি চরিত্রগুলোর থেকে একটু আলাদা।
আপনার সঙ্গে ছোট বউ শ্যামৌপ্তির একটা বন্ডিং তৈরি হচ্ছে।
– তার জন্য আমাকে ধন্যবাদ দাও। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার ছোট বোন কে করছে? জানলাম ও করছে। শ্যামৌপ্তি এল, নন্দিতাদি বলল, কেমিস্ট্রি দরকার। শুটিংয়ের প্রথম দিনে, ওর সঙ্গে আমিই অনেক গল্প করতে শুরু করলাম। আমার তো নিজের বোন আছে, তাই সিস্টারলি ফিলিংটা চলে এসেছিল।
শুটিং কেমন হয়েছিল?
– শিবুর সঙ্গে দু’দিন বসেছিলাম। এত ভালো ভালো সহ-অভিনেতা, খুব হেল্প হয়েছে বলতে পারো। শুনে রিঅ্যাক্ট করতে পারলেই সিন হয়ে যায়। সোহিনী সেনগুপ্ত, অনামিকা সাহা, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়। সবাই এত ভালো, কোনও সমস্যা হয়নি। সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা-এগারোটা অবধি শুটিং করতাম কিন্তু মনেই হত না। এত সুন্দর বন্ডিং হয়ে গেছে সবার সঙ্গে, মনে হয় না আর কোনও ছবিতে এমন হয়েছে। নন্দিতাদি একদম মায়ের মতো, এত যত্ন করেছে।
এমন সময়ে দাঁড়িয়ে জমিদার বাড়ির গল্পে লোকের আগ্রহ হবে?
– কেন হবে না? এটা গোয়েন্দা গল্প। এই ধরনের গল্প সবাই দেখে। যেমন, মিস মার্পল-এর গল্প। এটা ডিটেক্টিভ মার্ডার মিস্ট্রি, ভালো লাগবে।
বিবেক অগ্নিহোত্রীর ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ আবার রিলিজের কথা। যে ছবি এখানে রিলিজ করতে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ ছিল প্রোপাগান্ডা ফিল্ম। কী বলবেন?
– যদি ছবিটা মানুষকে প্ররোচনা দেয়, অশান্তি বাধায়, তাহলে রিলিজ না হওয়া উচিত। আমরা খুব অশান্ত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। মোদ্দা কথা, শান্তি বিঘ্নিত হয়, এমন কিছু চাই না।
সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে একটা ছবির কথা হচ্ছে আপনার শুনছিলাম।
– উনি আরডি বর্মনের ওপর একটা ছবি প্রযোজনা করছেন। আমার বাবার পরিবারের সঙ্গে ওঁরা জড়িয়ে। আমাকে একটা গানের দৃশ্যের (রুবি রায়) জন্য বলেছেন। আর হনসল মেহতার সঙ্গে যে সিরিজটা করলাম ওটা নেটফ্লিক্সে আসার কথা এ বছর।
নতুন সরকারের কাছে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কী চাহিদা?
– দেশের উন্নতি, মানুষের উন্নতি নিশ্চয়ই চাই। এই বদলটা বাংলার মানুষ চেয়েছিল, তাই হয়েছে। আমি চাই, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি। আগে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি শিরোনামে ছিল। মুম্বইয়ে গিয়ে শুনতে হয়– ‘কি নিম্ন মানের বাংলা ছবি’। আমি চাই ওই ইমপ্রেশনটা পাল্টাক। ক’জন আসে মুম্বই থেকে কলকাতায় শুটিং করতে! বাংলা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে ভয়টা যেন কেটে যায়। আগে যেমন বাংলা ইন্ডাস্ট্রির সুনাম ছিল, তেমনটা ফিরে আসুক চাই।
আপনার মা মুনমুন সেন একসময় তৃণমূলের হয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। আপনার কাছে রাজনীতিতে যোগদানের প্রস্তাব এসেছে?
– মা অত কিছু জানত না, কিন্তু তখন জয়েন করেছিল রাজনীতিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের পরিবারের প্রতি সব সময় সহৃদয় ছিলেন। ব্যক্তি মমতাদির কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তারপরেও মা নিজেই আমাকে বলেছিল, ‘রাজনীতিতে এসো না। ইট’স নট ইওর কাপ অফ টি।’ আমি কিছু জানিও না। নিশ্চয়ই, আমাকে অনেকেই অফার করেছিল।
বিজেপি থেকে?
– এসেছিল প্রস্তাব। কিন্তু যা হচ্ছে চারদিকে। রাজনীতি থেকে আমার দূরে থাকাই ভালো। আমি শুধু অভিনয়টাই করি।