'মমতার পক্ষে কেউ না থাকলে আমি দাঁড়াব', বিকাশ ভট্টাচার্যের মন্তব্যে অস্বস্তিতে বামেরা
eTV Bharat | ২৩ মে ২০২৬
কলকাতা, 23 মে: তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক ও তাঁর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তীর হয়ে আদালতে সওয়াল করছেন সিপিআইএম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। এই নিয়েই 'গেল গেল' রব বঙ্গ সিপিএমের অন্দরে। সামাজিক মাধ্যমে কার্যত আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে সিপিএম সমর্থকদের দুনিয়া। দ্বিধা বিভক্ত বামেরা৷ দলীয় কর্মী-সমর্থকরা যখন সমালোচনায় সরব, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে মামলা লড়ার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন বিকাশ ভট্টাচার্য৷ রাজনীতিক মামলা না হলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে কোনও আইনজীবী সওয়াল করতে রাজি না হলে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে সওয়াল করবেন বলেই স্পষ্ট জনিয়েছেন বর্ষীয়ান এই সিপিআইএম নেতা তথা আইনজীবী।
পার্টির দুরবস্থার জন্য কেউ কেউ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে দায়ী করছেন, কেউ আবার বিকাশের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। কেউ আবার বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে সম্মান জানিয়েই হয় পেশা, না হয় পার্টি— যে কোনও একটি বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। যদিও সিপিএম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির তরফে এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা বক্তব্য দেওয়া হয়নি। কিন্তু, যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম বিরূপ মন্তব্য করেছেন, করছেন তাদের কার্যত 'মূর্খ' বলেই পাল্টা তোপ দেগেছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য।
রাজনৈতিক নেতা আইনজীবী হয়ে অন্য রাজনীতিক দলের হয়ে সওয়াল করা ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। একই কারণে কংগ্রেস নেতা কপিল সিব্বল কিংবা অভিষেক মনু সিংভি বারে বারে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছেন। সিপিএমের বহু নেতা তা নিয়ে বহুবার প্রশ্ন তুলছিলেন। তুলে থাকেন। একইভাবে কংগ্রেসের তরফে এই মুহূর্তে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা অশোক ভট্টাচার্য বলেন, "কপিল সিব্বাল, মনু সিংভীরা মামলা লড়লে তৃণমূলের দালাল আর বিকাশবাবু লড়লে তিনি পেশাদার উকিল !"
তবে, এই প্রথম নয়, এর আগে প্রায়ত মুকুল রায় বিজেপিতে থাকাকালীন তাঁর হয়ে মামলা লড়েছিলেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। সেই সময়ও তা নিয়ে জলঘোলা হয়েছিল। একই ভাবে, তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক ও তাঁর স্বামীর হয়ে আদালতে সওয়াল করায় ফের প্রশ্নে মুখে সিপিএম আইনজীবী নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। যদিও তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, "দুর্নীতি কিংবা খুন, হামলা বা অ্যাক্টিভিটির মামলা নয়। এটা নির্বাচনী হলফনামায় ত্রুটি সংক্রান্ত মামলা।" যদিও সেই যুক্তি মানতে নারাজ সিপিএম কর্মী-সমর্থকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিপিএমের এক নেতা বলেন, "দেবরাজ নামের ছেলেটা হল ভাইপোর টাকা তোলার মেন এজেন্ট, একটা আস্ত ক্রিমিনাল৷ নিয়োগ দুর্নীতিতে অন্যতম অভিযুক্ত, এসএসসি দুর্নীতিতে উত্তর চব্বিশ পরগনায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছ টাকা তোলার মুখ্য এজেন্ট এই চোরটা। আর সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে কী করেছে, কীভাবে দিনের পর দিন ভোট লুট ,তোলাবাজি করতো সেটা রাজারহাটের মানুষজন জানেন৷ একে আইনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানে দুর্নীতিগ্রস্ত, তোলাবাজদেরই অক্সিজেন দেওয়া।"
সিপিএম বর্ধমান জেলার এক নেতা বলেন, "পার্টি লাইনের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। শুধু মনে করিয়ে দিলাম। যত বেশি দেরি করবেন, তত পার্টির ক্ষতি হবে।" আরও এক নেতার মতে, "এটাই মাথায় ঢুকলো না। মনু সিংভি এই কাজ করলে আমরা ছেড়ে কথা বলি না। দলের বর্ষীয়ান নেতা এমন কাজ করলে সত্যিই ডিফেন্ড করার জায়গা থাকে না। চুরির বিরুদ্ধে বলব, আর চোরের হয়ে লড়বো, দুটো কাজ একসঙ্গে হয় না।"
তবে, এসবকে পাত্তা দিতেই নারাজ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর যুক্তি, "এখন যে কেউ যা খুশি বলতে পারেন। বিজেপি নেতা মুকুল রায়, সব্যসাচী দত্তর মামলাও আগে লড়েছি। কোনও সিপিএম কর্মী খুন, হামলার মামলায় নয়। না বুঝে মূর্খের মতো মন্তব্য করছেন। নীতিও বোঝেন না।"
প্রসঙ্গক্রমে তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির মামলা না হলে ভেবে দেখব।" একই ভাবে, রাজনীতিক মামলা না হলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে কোনও আইনজীবী সওয়াল করতে রাজি না হলেও বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য মমতার হয়ে সওয়াল করবেন বলেই স্পষ্ট জনিয়েছেন।
এর আগেই রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসা ও অন্যান্য বিদ্যালয়ে 'বন্দে মাতরম' গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সরকারি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করের বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ৷ এই পদক্ষেপকে 'অসাংবিধানিক' বলেও তোপ দেগেছেন তিনি ৷ এই প্রসঙ্গে বিকাশরঞ্জন বলেন, "মাদ্রাসা এবং অন্যান্য বিদ্যালয়ে 'বন্দে মাতরম' গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই প্রচেষ্টা অসাংবিধানিক। উপযুক্ত সময়ে হাইকোর্টে এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানান হবে।"
পশু জবাই নিয়ে রাজ্যের আরও এক বিজ্ঞপ্তি নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেছেন সিপিএম নেতা তথা আইনজীবী ৷ বিকাশ ভট্টাচার্যের দাবি, এই পদক্ষেপ পশু ব্যবসায়ীদের জীবিকার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে ৷ তাঁর কথায়, "ধর্মীয় বিবেচনার দ্বারা পরিচালিত যে কোনও নীতি ব্যর্থ হতে বাধ্য ৷ পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই এমন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে ৷"
একদিকে রাজ্য সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন, বিরোধিতা করছেন; অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক, নেতার হয়ে আদালতে সওয়াল করার সিদ্ধান্তে দলের অনেকের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন সিপিআইএম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁকে নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত সিপিএম-এর কর্মী-সমর্থক-নেতৃত্ব৷