ভিড় ৫ মেডিকেলে, ডাক্তার না থাকায় বেড খালি কলকাতার বহু সরকারি হাসপাতালেই
বর্তমান | ২৪ মে ২০২৬
বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: শহরের পাঁচ সরকারি মেডিকেল কলেজে সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি বেড। তাও সারাক্ষণ শুনতে হয়, ‘বেড নেই, বেড নেই’! মন্ত্রী-বিধায়ক-নেতা থেকে আমলা—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে অনুরোধের আসর, ‘দাদা, একটু দেখুন প্লিজ! বেড না পেলে রোগী যে মারা যাবে!’ যাঁদের ‘ভাই-দাদা’ ধরার সাধ্যটুকু নেই, তাঁরা বরাতজোরে বেড পেলে ভালো! না হলে লাট্টুর মতো চরকিপাক চলে পাঁচ জায়গায়। শেষে হাঙরের মতো তাঁদের ‘গিলে নেয়’ ছোটো বা মাঝারি নার্সিংহোম!
পরিস্থিতি যখন এরকম, মুদ্রার অপর পিঠে তখন শহরেরই কিছু সরকারি হাসপাতালে শত শত বেড খালি! ঝকঝকে-তকতকে, রং করা পেল্লাই বিল্ডিং, ওয়ার্ডে সার সার বেড—সব আছে। কিন্তু সেখানে রোগী নিয়ে গিয়ে লাভ নেই! লোকবল কোথায়? নেই চিকিৎসকও। আবার বেশ কিছু হাসপাতালে লোকবল থাকলেও আশপাশে রয়েছে উন্নত পরিকাঠামোর সরকারি হাসপাতাল। তাই ওই সব স্টেট জেনারেল হাসপাতালের গুরুত্ব দিন দিন কমছে।
ফুলবাগানের বি সি রায় শিশু হাসপাতাল রাজ্যের এক নম্বর সরকারি শিশু হাসপাতাল। তার দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বেলেঘাটায়। আইডি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে। লোকমুখে প্রচলিত নাম বি সি রায় পোলিও হাসপাতাল। সরকারি নাম ‘ডাঃ বি সি রায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক সায়েন্সেস, বেলেঘাটা ক্যাম্পাস’। করোনার সময় রং করে, যন্ত্রপাতি এনে ঢেলে সাজা হয়েছিল হাসপাতালটি। কিন্তু লোকবলই দেয়নি স্বাস্থ্যভবন। ফল? ১১০ বেডের এই হাসপাতালে গড়ে ভরতি থাকছে ২৫-৩০ জন শিশু। এই বেডগুলিতে আবার সরকারিভাবে ৭২টি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (পিকু) বেড থাকার কথা। বাস্তবে কোথায় ৭২টি পিকু? দুই ক্যাম্পাস মিলিয়ে কমবেশি ১০০ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। আছেন ২০-২৫ জন। শিক্ষক চিকিৎসকের সংখ্যাও তথৈবচ। তাই হাড় ভেঙেছে, এমন বাচ্চারা ছাড়া দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে আর কোনো শিশু ভরতি থাকে না।
বাঘাযতীন ও বিজয়গড় স্টেট জেনারেল হাসপাতাল একসময় দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই সরকারি হাসপাতাল ছিল। এই দু’টি হাসপাতালে অনুমোদিত বেডের সংখ্যা যথাক্রমে ১০৬ এবং ৬২। কিন্তু বাঘাযতীনে মাত্র ৫০ শতাংশ ও বিজয়গড়ে মেরেকেটে ২৫ শতাংশ রোগী ভরতি থাকেন। উত্তর কলকাতা ও উত্তর শহরতলিতে রয়েছে এমন বহু সরকারি হাসপাতাল। যেমন পাইকপাড়ার ইন্দিরা মাতৃসদন। এখানে এখন ইনডোর পরিষেবাই বন্ধ। কাশীপুরের নর্থ সুবারবার্ন হাসপাতালে বেড সংখ্যা ৫৭। এখানেও বহু বেড বছরভর রোগীশূন্য থাকে।
হাসপাতালগুলিকে কাজে লাগাতে পূর্বতন সরকার বিভিন্ন মেডিকেল কলেজগুলির সঙ্গে এগুলি জুড়ে দিয়েছিল ‘অ্যানেক্স হাসপাতাল’ হিসাবে। কিন্তু এই মডেল ‘হিট’ করেছে শুধু পিজিতে (শম্ভুনাথ, পুলিশ হাসপাতাল, খিদিরপুর মেটরিনিটি হোম, রামরিক দাস হরলালকা হাসপাতাল)। তাহলে উপায়? স্বাস্থ্যকর্তারা বলছেন, উপায় শহরজুড়ে কম ব্যবহৃত সরকারি হাসপাতালগুলিতে স্থানীয়দের জন্য কিছু প্রাথমিক পরিষেবা রেখে বাকিটা ‘স্পেশালাইজড হাসপাতাল’-এ রূপান্তরিত করা। শহরে সুনির্দিষ্ট হার্টের হাসপাতাল, কিডনি বা ইউরোলজি হাসপাতাল, বাচ্চাদের জটিল সার্জারির সুনির্দিষ্ট হাসপাতাল নেই। এটা করা গেলে পাঁচ মেডিকেল কলেজের উপর চাপ কমবে। কমবে রোগীদের ভোগান্তিও।
এ বিষয়ে বিজেপির চিকিৎসক বিধায়ক ডাঃ ইন্দ্রনীল খান বলেন, ‘চারদিকে শুধু হাসপাতাল বাড়িই করেছিল আগের সরকার। কিন্তু লোক দেয়নি। পরিকল্পনা করেনি। তাই এমন বৈপরীত্য। সময় দিন। নিশ্চয় এর পরিবর্তন হবে।’ -নিজস্ব চিত্র