ক্ষমতায় থাকার সময়ে যে এলাকা দুর্গ হয়ে উঠেছিল, ক্ষমতা হারানোর ২০ দিনের মধ্যেই তা পরিণত হলো তাসের ঘরে! ভোটের আগেই দুর্গের প্রহরী ‘পুষ্পা’ মাথানত করায় কার্যত ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে গেল বিজেপি। ফলতাবাসীও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথা রাখলেন। সেই মতো তাঁর দলের প্রার্থী লাখখানেক ভোটেই জিততে চলেছেন। অন্য দিকে, বিরোধী পরিসরের শূন্যস্থান পূরণের খানিক চেষ্টা করল সিপিএম।
গত বৃহস্পতিবার ফলতায় পুুনর্নির্বাচনের দিন ময়দানেই ছিলেন না তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। রবিবার ভোটের ফল প্রকাশের দিনেও একই ছবি দেখা গেল। সারাদিনই অন্তরালে রইলেন পুষ্পা। ভোটের দিনে যেমন কোনও ভোটকেন্দ্রেই তৃণমূলের এজেন্ট ছিল না, ফল প্রকাশেও গণনাকেন্দ্রে দেখা গেল না তৃণমূলের কোনও এজেন্টকে। ভোটগণনা শুরু হওয়ার পর প্রথম রাউন্ড থেকেই এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী দেবাশিস পণ্ডা। তাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, দিনের শেষে ছবিটা ঠিক কী রকম হতে চলেছে।
পুনর্নির্বাচনের দু’দিন আগে জাহাঙ্গির ভোটের ময়দান ছেড়ে সরে যাওয়ার ঘোষণা করায় ফলতায় বিজেপির জয় মোটামুটি নিশ্চিত বলেই ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। শেষ দিনের প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু এক লক্ষ ভোটে জেতার লক্ষ্যমাত্রাও বেঁধে দিয়ে এসেছিলেন। তাই নজর ছিল শুধু ব্যবধান। ১৮ রাউন্ড গণনা শেষে বিজেপি প্রার্থী এগিয়ে প্রায় ৯২ হাজার ভোটে। যে ফলতায় গত লোকসভা ভোটে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার ভোটে তৃণমূল ‘লিড’ নিয়েছিল, সেখানে এ বার জাহাঙ্গির পেলেন সাড়ে ৫ হাজারের কিছু বেশি ভোট। পুনর্নির্বাচনে খানিক নজর কেড়েছে সিপিএম। বামফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মি পেলেন ৩৭ হাজার ভোট। আর কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা পেলেন সাড়ে ৯ হাজার ভোট। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের নথিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপির আসন ২০৮-এ পৌঁছতে চলেছে।
গত মাসে বিধানসভা ভোটের সময় থেকেই নানা কারণে প্রচারের আলোয় চলে এসেছিলেন জাহাঙ্গির। উত্তরপ্রদেশের পুলিশকর্তা অজয়পাল শর্মা ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক হয়ে আসার পর তাঁর সঙ্গে জাহাঙ্গিরের ঠান্ডা লড়াই ভোটের উত্তাপে অন্য মাত্র যোগ করেছিল। কিন্তু ভোটের দিন বেশ কিছু বুথের ইভিএমে আতর, কালি, টেপ লাগানোর মতো অনিয়মের অভিযোগে ফলতার ভোটই বাতিল হয়ে যায়। কমিশন পুনর্নির্বাচনের ঘোষণা করে। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরে ফলতার পুনর্নির্বাচন ঘিরে পূর্বতন শাসকদল তৃণমূলের অন্দরে আর কোনও উত্তাপই দেখা যায়নি। গত ৪ মে ভোটের ফলপ্রকাশের পরে বেশ কিছু দিনেক জন্য কার্যত অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গির। পরে পুলিশ তাঁকে এলাকায় ফেরায়। এলাকায় ফিরে ‘পুষ্পা ঝুঁকেগা নেহি’ বলে হুঁশিয়ারিও দেন। কিন্তু তার কয়েক দিন পরেই তিনি জানিয়ে দেন, পুনর্নির্বাচনে তিনি নেই! ফলতার শুভেন্দুর উন্নয়ন-প্রতিশ্রুতির স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত। তৃণমূল অবশ্য জানিয়ে দিয়েছিল, এই সিদ্ধান্ত স্রেফ জাহাঙ্গিরের। দলের নয়।
এর মধ্যেই ফলতার নানা জায়গায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তৃণমূল জমানায় ভোট দিতে না পারার অভিযোগ তোলেন তাঁরা। স্থানীয়দের এই ক্ষোভকে কাজেও লাগিয়েছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু সেখানে জনসভা, রোড শো করেছেন। তাতে সাধারণ জনতার উপচে পড়া ভিড়ও দেখা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মত, পুনর্নির্বাচনের ফলাফলে তারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। ভোটের প্রচারে ফলতার জন্য স্পেশ্যাল প্যাকেজের ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ভোটে তারও প্রভাব পড়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
পালাবদলের পরে ফলতা জুড়ে তৃণমূলের প্রচার-কর্মসূচি কার্যত স্তিমিত হয়ে পড়ায় এলাকায় সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছিল সিপিএম-ও। গা-ঝাড়া দিয়ে সুযোগ কাজে লাগাতে দেখা গিয়েছে তাদের। সঙ্গে ছিল আইএসএফ। সিপিএম অন্দরের বক্তব্য, ফলতার ফলাফলে ক্ষমতার অদলবদল হওয়া সম্ভব নয়। তাই এই ভোটকে সাংগঠনিক প্রস্তুতি হিসাবেই দেখা হয়েছে। ভোট শতাংশ সামান্য যা বেড়েছে, তা হলো দলের জন্য ভবিষ্যতের পুঁজি।