ভুটানের বৃষ্টিতে বানভাসি আলিপুরদুয়ারে ভাঙল ১০ টি সাঁকো, বিচ্ছিন্ন বহু গ্রাম
আজ তক | ২৪ মে ২০২৬
Bhutan Heavy Rain: পাহাড়ের কান্না এবার সমতলের বুক ভাঙল। ভুটান পাহাড়ে শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টির জেরে কার্যত ত্রাহি ত্রাহি রব আলিপুরদুয়ার জেলাজুড়ে। ভুটানের পাহাড় বেয়ে নেমে আসা তোর্ষা, কালজানি, বাসরা, মুজনাই ও পানা নদীর জলস্তর একধাক্কায় মারাত্মক বেড়ে যাওয়ায় জেলার অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সাঁকো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ফলে বিঘ্নিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও নৌকাই এখন একমাত্র ভরসা, আবার কোথাও বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ভরা বর্ষার আগেই ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখে সিঁটিয়ে রয়েছেন ডুয়ার্সের মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবার সকাল থেকেই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন।
শনিবারের ভোরটা আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের তপসিখাতা ও উত্তর চকোয়াখেতি এলাকার মানুষের কাছে ছিল চরম বিপর্যয়ের। কালজানি নদীর তীব্র জলস্রোতে ভোর তিনটে নাগাদ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে দুটি বড় সাঁকো। ঘুম ভাঙতেই গ্রামবাসীরা দেখেন, যাতায়াতের পথ উধাও। পাটকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা চিরঞ্জিৎ ওরাওঁয়ের গলায় চরম উৎকণ্ঠা, "ভোররাতে যখন সাঁকোটা ভাঙল, কেউ টেরও পাইনি। নদীতে এখন রূপালী জলের বদলে শুধু হাহাকার। এই ভরা নদীতে নতুন করে সাঁকো হওয়া অসম্ভব।" প্রশাসন নৌকার ব্যবস্থা করলেও, উত্তাল নদীতে পারাপার করতে গিয়ে বুক কাঁপছে আট থেকে আশির। এই দুই এলাকার মানুষকে আগামী ৪-৫ মাস দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে।
দুর্যোগের কোপ পড়েছে অর্থনীতিতেও। শনিবার ছিল জটেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক হাট। কিন্তু ফালাকাটা ব্লকের দেওগাঁও এলাকায় মুজনাই নদীর ওপর থাকা চারটি বাঁশের সাঁকোই রাতে জলের তোড়ে ভেসে যায়। ফলে দেওগাঁও, বেলতলি, নবনগর ও ৫ মাইল এলাকার কৃষকরা খেতের টাটকা সবজি নিয়ে হাটে পৌঁছতেই পারলেন না। নদীর পাড় থেকেই অন্তত ৩০ জন প্রান্তিক চাষিকে চোখের জল ফেলে ফিরে যেতে হয়। দুপুরের পর নবনগরের গঙ্গামণ্ডল ঘাট ও সাধনের ঘাটে তড়িঘড়ি নৌকা নামিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়। অন্যদিকে, বঙ্কিমঘাটের পাকা সেতুর পাশে তৈরি অস্থায়ী ডাইভারশনটি ভেঙে যাওয়ায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে যান চলাচল। বেলা একটা নাগাদ আলিপুরদুয়ারের জেলা শাসক সহ পদস্থ কর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তড়িঘড়ি বঙ্কিমঘাটের অর্ধনির্মিত পাকা সেতুর ওপর লোহার পাত বিছিয়ে সাময়িকভাবে হেঁটে পারাপারের ব্যবস্থা করে দেয় প্রশাসন। তবে নিয়াশার ঘাটের সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় ভোগান্তি চরমে উঠেছে কয়েক হাজার মানুষের।
ক্ষয়ক্ষতির এখানেই শেষ নয়। শুক্রবার রাত সাড়ে আটটা থেকে কালচিনি ব্লকে শুরু হয় মেঘভাঙা বৃষ্টি। টানা ৪-৫ ঘণ্টার সেই তাণ্ডবে জলমগ্ন হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা। বাসরা ও পানা নদীর জলস্ফীতির জেরে ভুটান সীমান্ত ঘেঁষা সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা বাগান পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে জয়গাঁ ও কালচিনির থেকে। শনিবার সকালে পানা নদীর জল কিছুটা কমলে সামান্য স্বস্তি ফিরলেও আতঙ্ক কাটেনি। এদিকে সীমান্ত শহর জয়গাঁর এনএস রোড সহ একাধিক ওয়ার্ড জলমগ্ন। পুরোনো হাসিমারার সার্ক রোডেও এখন থইথই জল। কালচিনির মোদীলাইন ও মালিবাড়িতে নিকাশি নালা উপচে নোংরা জল ঢুকে পড়েছে মানুষের শোবার ঘরে। শনিবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সেচ দপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে জয়গাঁ-১ পঞ্চায়েতের যোগীখোলা ও খারখোলা এলাকা পরিদর্শনে যান কালচিনির বিধায়ক বিশাল লামা। তিনি দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। নদীগুলির রূপ এখন শান্ত হলেও, আকাশের মুখভার দেখে নতুন বিপদের আশঙ্কায় প্রহর গুনছে আলিপুরদুয়ার।