• পুরুলিয়া টু ফলতা, পদ্ম ফোটার নেপথ্যে কুড়মি নেতা জ্যোতির্ময়ের ‘পাওয়ার করিডর’ কাহিনি
    প্রতিদিন | ২৫ মে ২০২৬
  • ১১ মে থেকে ২১ মে। টানা ১১ দিন। ফলতার তৃণমূল প্রার্থীর ‘ঝুঁকেগা নেই’ সংলাপ ভুলিয়ে তাঁকে ময়দানছাড়া করে, মাথানত করিয়ে চূর্ণ করে দিলেন ডায়মন্ড হারবার মডেল! রবিবার বিজেপি প্রার্থীকে জিতিয়ে আনলেন ১ লক্ষের বেশি ভোটে। এই বিপুল জয়ের অনুপ্রেরণা অবশ্য রাজ্যজুড়ে গেরুয়া ঝড়। তবে এর নেপথ্যে পুরুলিয়ার কুড়মি বিজেপি নেতা তথা সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর ‘পাওয়ার করিডর’। প্রথমে পুরুলিয়াকে ৯-০, কুড়মি জনজাতির ভোটকে এককাট্টা করে জঙ্গলমহল থেকে তৃণমূলকে ধুয়েমুছে সাফ করার পর ‘ডায়মন্ড হারবার মডেলে’র ফলতাতেও পদ্ম ফুটিয়ে দিলেন তিনি।

    তিনি বঙ্গ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক। পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। ঝালদা ১ নম্বর ব্লকের পুস্তি গ্রাম পঞ্চায়েতের পাতরাডি গ্রামে বাড়ি তাঁর। ঝাড়খণ্ড ছুঁয়ে থাকা প্রান্তিক পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের অর্থনীতিতে স্নাতক কুড়মি বিজেপি নেতা এখন লাইমলাইটে। শুধু রাজ্যে নয় দিল্লিতেও। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের এই কর্মীর ক্রমেই গুরুত্ব বাড়ছে বিজেপিতে। কেন্দ্রের মন্ত্রিসভার রদবদল হলে জঙ্গলমহলের এই কুড়মি নেতা মন্ত্রী হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, এই পরিবর্তনের ‘আঁধি’তে শুধু পুরুলিয়া টু ফলতা নয়। বিস্তীর্ণ বনমহল-সহ হুগলি জয়েও তাঁর অবদান। রবিবার দুপুরের আগেই সমাজমাধ্যমে জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো পোস্ট করে জানান, ‘আজ ফলতা বিধানসভার ভোটগণনা ক্যাম্পে সকল নেতৃত্ব এবং কার্যকর্তাদের সঙ্গে জয়ের অপেক্ষায়।’

    ২০১৯ সালের এপ্রিল। বঙ্গ বিজেপির নজরে আসেন কুড়মি জনজাতির এই তরুণ নেতা। পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রচারে এসে জ্যোতির্ময়কে তিন তিনবার পিঠ চাপড়ানি দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘দিল্লি আপকে সাথ মে হ্যায়। হামে খবর হে আপ জিতো গে। পুরুলিয়া কো আগে বড়ানা হে।” সেবারই তিনি ২ লক্ষের বেশি ভোটে জয়লাভ করেন। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। কৃষক পরিবারের বিজেপির কুড়মি জনপ্রতিনিধি বঙ্গ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বনে যান। একেবারেই প্রান্তিক এই কুড়মি সাংসদ নিজেকে সবকিছু দিক থেকে আরও আপডেট করে দলে নিজের গুরুত্ব বাড়িয়ে নেন।

    ২০২৪-এর লোকসভায় তাঁকে ঘিরে দলে খানিক অন্তর্ঘাত হলেও ১৭ হাজারের বেশি ভোটে জয় পেয়ে দ্বিতীয়বার সাংসদ হন তিনি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় তাঁকে ঘিরে ঘরে-বাইরে সমালোচনা। ছাব্বিশের বিধানসভায় পুরুলিয়ার অধিকাংশ আসন গুলিতেই তাঁর পছন্দমত প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে ঘিরে আবার বিতর্ক তৈরি হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন ইস্যুতে বারে বারে তাঁকে নিশানা করেছিলেন। কিন্তু সেই বিতর্কেও একাই জল ঢেলে দিলেন তিনি। দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগে নিজেকে বদলে ফেললেও মাটির সঙ্গে যে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়নি তা বুঝিয়ে দিলেন পুরুলিয়াকে একেবারে ৯-০ করে। ফলতাতেও নিজ হাতে ভোট সামলে ডায়মন্ড হারবার মডেল চূর্ণ করে জবাব দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও।

    জ্যোতির্ময়ের রাজনৈতিক কেরিয়ারের এই লম্বা জার্নিতে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে আসা যাক। জাতিসত্তার আন্দোলনে তৎকালীন শাসক তৃণমূলের উপর কুড়মি ক্ষোভকে নিজের দলের পক্ষে কাজে লাগাতে একেবারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতোকে বসিয়ে দেন জ্যোতির্ময়। সেদিনই তিনি জঙ্গলমহলের ৪ জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরে তৃণমূলকে দুরমুশ করার নীল নকশা সাজিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর জেলার ৯ টি বিধানসভায় গিয়ে একেবারে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করে দেন।

    এরপর ৯ মে রাজ্যের নতুন সরকারের শপথের পর ১১-১২ মে দলীয় বৈঠকে ফলতার নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। ১৩ মে থেকে ফলতার মাটিতে পড়ে থেকেছেন। কখনও ছোট ছোট মিটিং, মিছিল, আবার কখনও কর্মী বৈঠকে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা, আবার কখনও শুধুই জনসংযোগ। ১৬ মে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতার জনসভায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোদের বানানো রুটেই তিনি ১৯ তারিখ মেগা প্রচার করবেন। আর সেই দিনই নিজেকে ‘পুষ্পা’ বলে প্রচারে আসা ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

    কিন্তু তারপরেও ২১ মে ভোটের সকাল পর্যন্ত ফলতার মাটিতে থেকে বিকালে দুর্গাপুরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেন। তারপর ৩ দিন পুরুলিয়ায় কোর কমিটির বৈঠক, ঝালদায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন সভায় উপচে পড়া ভিড়ে শামিল থেকে রবিবার সাতসকালে ফলতায় বিজেপির ভোটশিবির। বিজেপি প্রার্থীর বিপুল জয়ে বুঝিয়ে দেন, জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক উপেক্ষার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছেন তিনি। কারণ সেই দীর্ঘ বাম আমল থেকে তৃণমূল জমানা। পুরুলিয়ার বাম-ডান সব রাজনীতিকরাই থেকেছেন প্রান্তসীমায়। বড় নেতাদের ছায়ার আড়ালেই কেটেছে তাঁদের রাজনৈতিক জীবন। সেখানে ব্যতিক্রমের নাম জ্যোতির্ময়!
  • Link to this news (প্রতিদিন)