বিশ্বাস ব্রাদার্স নয়, ইন্ডাস্ট্রির রাক্ষস-খোক্ষস অন্য কেউ! অভিযোগের নিশানায় কোন কোন বড় নাম
eTV Bharat | ২৫ মে ২০২৬
কলকাতা, 24 মে: 'ভয় নয় ভরসা চাই, টেনশনমুক্ত টলিপাড়া চাই', শনিবার সন্ধ্যায় এমনই স্লোগান উঠল টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়ো চত্বরে। বিজেপি সমর্থক তথা টেকনিশিয়ানরা এদিন জড়ো হন সেখানে। গর্জে ওঠেন এতদিনকার ভয়, হুমকি, কাজ হারানো, কাজ না পাওয়ার প্রতিবাদে। অভিযোগ করেন, বিশ্বাস ব্রাদার্স নয়, ইন্ডাস্ট্রির রাক্ষস-খোক্ষস অন্য কেউ ! তাঁদের নিশানায় ছিল টলিউডের বেশ কিছু বড় নাম।
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই বদলের হাওয়া টলিপাড়াতেও। টলিপাড়াকে ভয়মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত করতে, কাজের সমবন্টন বজায় রাখতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব দিয়েছেন দলীয় বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে। সম্প্রতি টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর রুদ্রনীল ঘোষ ঘোষণা করেছেন, "এখন থেকে ভয় আউট ভরসা ইন।" আর এর পর থেকেই ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে এতদিনের চাপা ক্ষোভ আজ একে একে সামনে আসছে সকলের।
ইন্ডাস্ট্রির আসল 'রাক্ষস-খোক্কস' কারা ?
অরূপ এবং স্বরূপ বিশ্বাসকে ইন্ডাস্ট্রির 'রাক্ষস-খোক্ষস' বলে দাবি করেছেন টালিগঞ্জের বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। তবে, এদিন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক হেয়ার ড্রেসারের মুখে শোনা গেল অন্য কথা। তিনি বললেন, "কাছের আর পছন্দের মানুষ না-হলে এখানে কাজ পাওয়া যায় না। আর কাদের কাছের মানুষ হতে হবে? বাবাই আর হাসানের। সিনে প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ডের তরফে টেকনিশিয়ানদের একটা বিক্ষোভ ছিল আজ। কারণ ম্যানেজার গিল্ডে এই মুহূর্তে যারা রয়েছে মানে হাসান, বাবাইরা ভীষণ স্বজনপোষণ বা একপেশে কাজ করে চলেছে দিনের পর দিন। জয়ন্ত কুণ্ডু এক সময় স্বরূপ বিশ্বাসের ডান হাত ছিলেন। এখন দু'জনের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে।"
তিনি আরও বলেন, "নিয়ম আছে একজন প্রোডাকশন ম্যানেজার একসঙ্গে একটা কাজই করতে পারবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাবাই আর হাসানের আনুকূল্যে একজন একাধিক কাজ করছেন। আর তাঁরা ওদেরই কাছের লোক। বাকিরা বসে আছে। আসল কথা হল প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছের লোক হতে হবে। এর জন্য হাসান আর বাবাইকে কাটমানি, কমিশন দিতে হয়। মেগা সিরিয়ালের কাজ হলে মাসিক কমিশনের ব্যাপার আছে। কম্প্রোমাইজের গল্প তো আছেই। পুরুষ এবং নারীদের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজের ধরনটা আলাদা।"
স্বরূপ বিশ্বাসের ভূমিকায় প্রশ্ন
তাঁর কথায়, "হাসান এবং বাবাই নটোরিয়াস। কন্ট্রোল করতে চায় ইন্ডাস্ট্রিটাকে। স্বরূপবাবু ওদের উপর দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। স্বরূপবাবু তো এখনও প্রেসিডেন্ট, ওনার কাছে পৌঁছনো সবার সম্ভব না। উনি সবার ফোনও ধরেন না। তাই বাবাই আর হাসানের সঙ্গেই কথা বলতে হয়। এই সব ভুল লোকদের দায়িত্ব দিয়ে বসে আছেন স্বরূপবাবু। তার মাশুল গুনছি আমরা। আর বদনাম কুড়োচ্ছেন স্বরূপবাবু। আমরা স্বরূপবাবুকে সবটা জানাই। উনি দেখব বলেছিলেন। পরে বলেন, হাসান, বাবাইকে ডাকা হলে তারা সময়ের অভাবে স্বরূপবাবুর সঙ্গে নাকি দেখা করতে পারেনি। আমরা মজুরি বৃদ্ধির টাকাও পাচ্ছি না। খুব খারাপ অবস্থায় আছি আমরা। পাপিয়া অধিকারী বারবার বলছেন ইন্ডাস্ট্রির রাক্ষস-খোক্ষস বিশ্বাস ব্রাদার্স। ইন্ডাস্ট্রির আসল রাক্ষস-খোক্কস বাবাই আর হাসান।"
টেকনিশিয়ানদের ক্ষোভ
শনিবার দুপুরে সহ-পরিচালক গিল্ডের একাংশ সদস্যের প্রতিবাদের পর এদিনই সন্ধ্যায় টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়োতে জড়ো হন প্রোডাকশন ম্যানেজার, মেক আপ আর্টিস্ট, সাউন্ড, ইলেকট্রিক গিল্ডের সদস্যরা। এতদিনের জমে থাকা ক্ষোভ উগড়ে দেন তাঁরা। উঠে আসে গিল্ডের কার্ড না পাওয়া, নির্বাচনের অস্বচ্ছতা, দিনের পর দিন কাজ না-পাওয়া, স্বজনপোষণের কথা। তাঁরা বলেন, "অরূপ বিশ্বাস-স্বরূপ বিশ্বাসের হাত ধরে টলিপাড়া হয়ে উঠেছিল নেক্সাসের আরত। আর সেটা বানাতে বিপুল ভূমিকা ছিল হাসান, বাবাই, রাজীব পাল, বাপি মালাকারদের মতো টেকনিশিয়ানদের। "
অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সুব্রত বিশ্বাস বলেন, "এক একজন দু-তিনটে সিরিয়ালের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে। অন্যরা বসে আছে। কাজ নেই। এগুলো দিনের পর দিন চলছে। "
নিশানায় অভিনেতা দেব
কার্ড প্রসঙ্গে উঠে আসে আরেক তথ্য। সুপারস্টার, সাংসদ দেবকে বাড়ি বয়ে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে কার্ড দিয়ে আসা হয়েছিল। টেকনিশিয়ানদের প্রশ্ন, "সুপারস্টার, সাংসদ দেব অধিকারীকে এক প্রকার শারদ সম্মান জানিয়ে কার্ড দিয়ে আসা হল বাড়ি বয়ে গিয়ে। দেব কি এসে প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজ সামলাতেন, যে উনি কার্ড পেলেন? এভাবেই পছন্দের মানুষেরা কার্ড পাচ্ছে। আর এগুলো দিনের পর দিন চালিয়ে যাচ্ছে হাসান, বাবাই, বাপি মালাকার, রাজীব পালদের মতো মানুষরা।"
কাঠগড়ায় পরমব্রত ও সৌরভ
উঠে আসে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং সৌরভ দাসের কথাও। বলা হয়, "পরম, সৌরভ দাসের রং পালটানো গিরগিটির মতো লোকদের টেনে নামাতে চাই, যারা টলিপাড়ায় নেক্সাসের জন্য সাহায্য করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।" বিক্ষুব্ধ টেকনিশিয়ানেরা আরও বলেন, "কোনওকিছু নিয়ে প্রতিবাদ করলেই বাতিল করে দেওয়া হত কার্ড। ঘোষণা করা হত, আজ এর কার্ড বাতিল। কে কে রাজি? হাত উঠলেই কার্ড বাতিল। আর কেউ হাত না তুললে নাকি তাকে মার্ক করে রাখা হত। পরে তার কাজ পাওয়া নিয়ে থাকত ঝুঁকি। নির্বাচন প্রক্রিয়াতেও কারসাজির চূড়ান্ত এখানে।"
সকলের মিলিত দাবি, দিনের পর দিন অনেকে কাজ না-পেয়ে বসে আছেন। অকারণে বাতিল হয়েছে অনেকের কার্ড। লাগাতার চলত হুমকি। টাকা না-দিলে মিলত না গিল্ডের কার্ড। তৃণমূল আমলে ভয়ের সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছিল টলিপাড়ায়। সেটা আর চাই না। নতুন সরকার আসার পর আজ সবাই স্বাধীন, মুক্ত এই ইন্ডাস্ট্রিতে।
স্বরূপ বিশ্বাসের বক্তব্য
এদিন মূল অভিযোগের তির মহম্মদ হাসান, বাবাই, বাপি মালাকার, স্বপন মজুমদারের বিরুদ্ধে। যাঁদের এতদিনের দাদাগিরিতে নাজেহাল টেকনিশিয়ানেরা। হাসান, বাবাই, বাপিদের শাস্তির দাবিতে টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়োতে আওয়াজ ওঠে শনিবারের সন্ধ্যায়। হাসানকে এদিন 'জঙ্গি'র তকমা দেওয়া হয়। এই ব্যাপারে ইটিভি ভারতের তরফে স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "সময়মতো সাংবাদিক বৈঠক করে সব অভিযোগ, সব প্রশ্নের উত্তর দেব।"