কলকাতা, 24 মে: ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের ভোটগণনা প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চরম অসঙ্গতি ও পক্ষপাতিত্বের বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার এক সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে নির্বাচন কমিশনকে (ইসিআই) তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে একই কেন্দ্রের ভোটগণনায় দু'রকম গতি দেখা যায়? দেশের মানুষের কাছে এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট জবাব দেওয়া উচিত বলে দাবি করেছেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ। একই সঙ্গে ফলতার দলীয় কর্মীদের ওপর হওয়া অত্যাচার এবং রাজ্যের নবনিযুক্ত মুখ্য সচিবের ভূমিকা নিয়েও একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন তিনি।
রবিবার বিকেলে নিজের অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে করা একটি পোস্টে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের গণনার গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে লেখেন, আজ দুপুর সাড়ে 3টের মধ্যেই ফলতার 21 রাউন্ডের সম্পূর্ণ ভোটগণনা প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গিয়েছে। অথচ, গত 4 মে যখন এই কেন্দ্রের মূল নির্বাচনের ভোটগণনা চলছিল, তখন ঠিক ওই একই সময় অর্থাৎ দুপুর সাড়ে 3টে পর্যন্ত মাত্র 2 থেকে 4 রাউন্ডের গণনা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। একই পরিকাঠামোয় গণনার গতির এই বিপুল ফারাক কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি একে 'বিরাট অসঙ্গতি' বলে চিহ্নিত করেছেন। দেশের সাংবিধানিক নির্বাচনী সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এই অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখ্যা ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের দেওয়া উচিত।
গণনার অসঙ্গতির পাশাপাশি ফলতার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দলীয় কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’। তাঁর অভিযোগ, গত 10 দিনে ফলতা এলাকার 1 হাজারেরও বেশি তৃণমূল কর্মীকে জোর করে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আদর্শ আচরণবিধি (এমসিসি) বলবৎ থাকা সত্ত্বেও দিনের আলোয় প্রকাশ্য দিবালোকে শাসকদলের একাধিক দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। কিন্তু, এত সবকিছুর পরেও নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে রয়েছে এবং সমস্ত ঘটনা জেনেও চোখ বন্ধ করে রেখেছে। নির্বাচনী আচরণবিধি জারি থাকার সময়েও কেন হিংসা রোখা গেল না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
এখানেই শেষ নয়, বিদায়ী মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) ভূমিকা এবং নতুন রাজ্য সরকারে তাঁর পদোন্নতি নিয়ে এক মারাত্মক প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার নামে ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়া এবং সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার জন্য নির্বাচন কমিশন ওই আধিকারিককে ব্যবহার করেছিল। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, যখন ফলতা কেন্দ্রে আদর্শ আচরণবিধি জারি রয়েছে এবং ভোটগ্রহণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি তখনও শেষ হয়নি, ঠিক সেই সময়েই বিতর্কিত ওই আধিকারিককে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের মুখ্য সচিব (Chief Secretary) পদে নিয়োগ করা হয়েছে। একটি কেন্দ্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিগত 4 মে-র গণনাকেন্দ্রের পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, সেদিন কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের ব্যবহার করে বিজেপি ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাউন্টিং এজেন্টদের (গণনা এজেন্ট) জোরপূর্বক গণনাকেন্দ্রের ভেন্যু থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও আধিকারিকদের এই ভূমিকা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মূল ভাবাবেগকেই সরাসরি আঘাত করে বলে তিনি মনে করেন। এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গভীর আশঙ্কার বিষয় বলে সমাজমাধ্যমের পোস্টে উল্লেখ করেছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, যতক্ষণ না পর্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং গোটা গণনা প্রক্রিয়ার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিসিটিভি (CCTV) অডিট করা হচ্ছে, ততক্ষণ এই নির্বাচনী রায়ের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠতেই থাকবে। এই অসঙ্গতি ধামাচাপা দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারির সুরে লেখেন, "সত্যকে চিরকাল চেপে রাখা যায় না।" ভোটগণনা ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিষেকের এই বিস্ফোরক পোস্টের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।