• কানপুর থেকে প্রয়াগরাজ, নদীখাত কি সেই সরস্বতীর? বেদে থাকা বর্ণনাকেই প্রতিষ্ঠা বিজ্ঞানের?
    এই সময় | ২৫ মে ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    বেদে নাকি সবই আছে— তির্যক ভঙ্গিতে এমনটা মাঝেমধ্যেই বলা হয়। তবে বেদে থাকা অনেক কিছুর মধ্যে বিতর্কিত একটি বিষয় নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে জোর আলোচনা ও চর্চা শুরু হয়েছে হালফিলের এক গবেষণার পরে।

    প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সঙ্গমের তিনটি নদীর দু’টি যে গঙ্গা এবং যমুনা— এ বিষয়ে প্রায় কারও কোনও সংশয় নেই। তৃতীয় নদীটি যে বেদ–বর্ণিত সরস্বতী, এমন বিশ্বাস বহু প্রাচীন। যদিও ওই অঞ্চলে সরস্বতী নদীর অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ কেউ এতদিনে দিতে পারেননি। এ বার কি তারই প্রমাণ পেলেন বিজ্ঞানীরা? উত্তরপ্রদেশের কানপুর থেকে প্রয়াগরাজ পর্যন্ত প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশে ভূপৃষ্ঠের গভীরে যে প্রাচীন নদীখাতের নিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, সেটা কি ওই সরস্বতী নদীর? ‘কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’–এর আওতায় থাকা ‘ন্যাশনাল জিওফিজ়িক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’–এর গবেষকরা অত্যাধুনিক হেলিবোর্ন ট্রানজ়িয়েন্ট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক প্রযুক্তি (এইচ–টিম) কাজে লাগিয়ে ভূপৃষ্ঠের ১০ থেকে ১৫ মিটার গভীরে ওই প্রাচীন নদীখাতের খোঁজ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

    ভূতত্ত্বগত অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত বর্ষীয়ান গবেষক সুভাষ চন্দ্র তাৎপর্যপূর্ণ এই আবিষ্কার সম্পর্কে জানিয়েছেন, কানপুর থেকে প্রয়াগরাজ পর্যন্ত অংশে গঙ্গা ও যমুনার মধ্যিখান দিয়ে একটি নদী যে প্রবাহিত হতো, সে বিষয়ে এখন আর কোনও সংশয় নেই। শুধু স্যাটেলাইট ইমেজিং নয়, একই সঙ্গে এইচ–টিম প্রযুক্তির সাহায্যে মাটির গভীরে যে ‘এমএআর স্ট্রাকচার’ পরীক্ষা করানো হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট বিজ্ঞানীরা। এমএআর স্ট্রাকচার বা ‘ম্যানেজ্‌ড অ্যাকুইফার রিচার্জ’ হলো এমন এক প্রযুক্তি–নির্ভর ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের জল, বৃষ্টির জল কিংবা পরিশোধিত পুনর্ব্যবহারযোগ্য জলকে ভূগর্ভস্থ অ্যাকুইফার বা জলস্তরে প্রবেশ করিয়ে ওই জায়গাতেই সঞ্চয় করা হয়। এই প্রযুক্তির ফলে যে প্রাচীন নদীখাতটির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে, বিজ্ঞানীদের মতে, সেটি কোনও সাধারণ ভূতত্ত্বগত গঠন নয়, গঙ্গা ও যমুনা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি প্রাচীন নদী ব্যবস্থার প্রমাণ হওয়ার সম্ভাবনা এখানে খুব বেশি।

    মাটির নীচ থেকে পাওয়া এই নদীখাতটি প্রায় চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার চওড়া হওয়ায় শুকিয়ে যাওয়া নদীটিকে গঙ্গা ও যমুনার মতো বৃহৎ নদীগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তা ছাড়া, এর গভীরতা ও ভিত্তিস্তর গঙ্গা ও যমুনার মতোই। যে কারণে বিজ্ঞানীরা একে কোনও ‘পুরোনো খাল’ বা ‘পরিত্যক্ত নদী’ নয়, বরং তাকে একেবারে আলাদা, তৃতীয় একটি রিভার সিস্টেম বলে মনে করছেন। গবেষক সুভাষ চন্দ্রর কথায়, ‘যদি কোনও নদী শুধু গতিপথ বদলাত, তা হলে তার ভূতাত্ত্বিক স্তর আলাদা হতো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তিনটি নদীর ভিত্তিস্তর প্রায় একই বলে দেখা যাচ্ছে। তার জন্যই আমরা মনে করছি, এটি সম্ভবত সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি নদী ছিল।’

    ২০১২–তে গবেষকরা প্রথম এই নদীখাতের খোঁজ পান। তার পরের বছর ছ’টি বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে পাইলট সার্ভে চলে। প্রয়াগরাজ ও কৌশাম্বীর প্রথম যে পাইলট সার্ভেটি চলে, সেখানেই প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূগর্ভস্থ চ্যানেলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরে বিশদ সমীক্ষা ও ড্রিলিংয়ের ভিত্তিতে ২০২১–এর ডিসেম্বরে আমেরিকান জিওফিজ়িক্যাল ইউনিয়ন–এর গবেষণা পত্রিকা ‘জিওফিজ়িক্যাল রিসার্চ লেটার্স’–এ একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়।

    বহু শতাব্দী ধরে হিন্দুরা বিশ্বাস করে এসেছেন, প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সঙ্গমে সরস্বতী নদী মিলিত হয়েছে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গে। এতদিন সেই নদীর অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ না–পাওয়া গেলেও চিড় খায়নি বিশ্বাস। আর এ বার বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সেই বিশ্বাস যেন আরও দৃঢ় হতে চলেছে।

  • Link to this news (এই সময়)