চঞ্চল প্রধান নন্দীগ্রাম
জমি রক্ষার আন্দোলনে ২০০৭–এর ১৪ মার্চ মারা গিয়েছিলেন নন্দীগ্রামের প্রলয় গিরি। শুভেন্দু অধিকারী রবিবার নন্দীগ্রামে আসবেন শুনে শহিদ প্রলয়ের দাদা পলাশ বলেছিলেন, ‘শুভেন্দুবাবু জমি আন্দোলনের নেতা। আমাদের সুখ–দুঃখের সাথী। আজ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, এটা আমাদের বড় পাওনা। তিনি এলে আমরা শহিদ পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাব।’
শহিদ পরিবারের বেঁধে দেওয়া সেই সুরেই রবিবার জমি আন্দোলনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন সভায় শুভেন্দু ঘোষণা করলেন, উন্নয়ন নিয়ে যে কথা দিয়েছিলেন সেই মতো কাজ হবে। রাস্তা, আলো, পানীয় জল, নিকাশি থেকে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান — সব হবে। গুরুত্ব দেওয়া হবে নারী সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে।
২০১১–য় সাড়ে তিন দশকের বাম জমানায় যবনিকা পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল নন্দীগ্রাম জমি রক্ষা আন্দোলন। ২০২৬–এ ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারকে গদিচ্যুত করতে সেই নন্দীগ্রাম থেকে সুর চড়িয়েছিলেন শুভেন্দু। তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পীঠস্থান থেকে এ দিন দৃপ্ত কন্ঠে শুভেন্দু বলেন, ‘আমার উপরে ভরসা রাখুন। ঋণ শোধ করব। নন্দীগ্রামে আমার বিধায়ক অফিস থেকে স্থানীয় মানুষের জন্য পরিষেবা দেওয়ার কাজ বজায় থাকবে। ঝড়–বৃষ্টিতে, আপদে–বিপদে যেমন পাশে ছিলাম, আগামী দিনেও থাকছি।’
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে এই নন্দীগ্রাম এবং কলকাতার ভবানীপুর — দু’টি কেন্দ্র থেকেই ভোটে লড়েছিলেন শুভেন্দু। জিতেছিলেন দু’টি থেকেই। তবে ভবানীপুর থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে সেই কেন্দ্রেরই বিধায়ক হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু। ফলে, ছেড়ে দিতে হয়েছে নন্দীগ্রাম। সেখানে সামনে উপনির্বাচন হবে। এই নন্দীগ্রাম শুভেন্দুর নিজের গড় বলে পরিচিত। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানই কার্যত নন্দীগ্রামের মাটি থেকে। তাই, তাঁর সঙ্গে নন্দীগ্রামের যে আত্মিক যোগ, তা যেন আরও স্পষ্ট করতে এ দিন তিনি ‘আমার বিধায়ক অফিস’ শব্দবন্ধটি সচেতন ভাবে ব্যবহার করেছেন বলে মনে করছেন নন্দীগ্রামের মানুষ।
শুভেন্দু এ দিন জানিয়েছেন, নন্দীগ্রামের উন্নয়নের সার্বিক পরিস্থিতি দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন কাঁথির সাংসদ, তাঁর সহোদর সৌমেন্দু অধিকারী। সঙ্গে থাকবেন বিজেপি–র পাঁচ বিধায়ক — দক্ষিণ কাঁথির অরূপ দাস, ভগবানপুরের শান্তনু প্রামাণিক, রামনগরের চন্দ্রশেখর মণ্ডল, তমলুকের নির্মল খাঁড়া এবং পটাশপুরের তপন মাইতি। এঁরা নন্দীগ্রাম বিধানসভার ১,২,৩,৪ এবং ৫ নম্বর মণ্ডলের দায়িত্বে থাকবেন।
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে এ দিন শুভেন্দু বলেন, ‘৬ একর জায়গা দেয়নি মমতা সরকার। যে কারণে বাজকুল-নন্দীগ্রাম সাড়ে সতেরো কিলোমিটার রেল লাইন নির্মাণ থমকে রয়েছে। ৩৪ বছরের বাম শাসন, ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের দুর্নীতিতে রাজ্য পিছিয়ে পড়েছে। রাজ্যকে দাঁড় করাতে হবে। পুলিশ যেন পার্টির ক্যাডার না হয়। মানুষ চায় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। মোদীজীর আশীর্বাদ নিয়ে সেই কাজ হবে।’
এ দিন তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ‘এলাকায় যারা গুন্ডামি করছে, সুশাসন কায়েম করতে আইনি পথে তাদের মোকাবিলা করা হবে।’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতার উপনির্বাচনের ফল বেরোনোর পরে রবিবার দেখা গিয়েছে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পন্ডা এক লাখ আট হাজার ভোটে জয়ী হয়েছেন। সেই প্রসঙ্গে তুলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান আরও বেশি করার পরামর্শ দিয়েছেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অনেকদিন থাকব, তেমন কাজ করতে হবে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষকে বলে গ্রামে গ্রামে উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’
এ দিন নন্দীগ্রাম থেকে এসে হলদিয়া ভবনে প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা শাসক নিরঞ্জন কুমার–সহ প্রশাসনের অন্য কর্তারা। সামনে বর্ষার কথা ভেবে হলদিয়ায় নিকাশির সংস্কার এবং নদীবাঁধ মেরামতিতে জোর দেওয়া হয়েছে আলোচনায়। পাশাপাশি রাস্তা, আলো, পানীয় জল সমস্যা মেটানোর কথাও বলা হয়েছে। চার বছর প্রশাসকের হাতে থাকার পরে আগামী নভেম্বরে হলদিয়ায় পুরসভার নির্বাচন হতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে।