আস্ত বৃদ্ধাশ্রম উধাও সরকারি খাসজমিতে বিলাসবহুল রিসর্ট, শান্তিনিকেতন নেপথ্যে কোন দুর্নীতি, উঠছে প্রশ্ন
বর্তমান | ২৫ মে ২০২৬
সংবাদদাতা, বোলপুর: শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি পল্লির বল্লভপুরডাঙায় একসময় গড়ে উঠেছিল অসহায় প্রবীণদের একটি আশ্রয়স্থল। জেলা পরিষদের অর্থানুকূল্যে খাসজমির উপর নির্মিত সেই বৃদ্ধাশ্রম আজ আর অস্তিত্ব নেই। সেই জায়গায় মাথা তুলেছে সুইমিং পুল, সবুজ লন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ এবং বিশাল প্রবেশদ্বার সমৃদ্ধ বিলাসবহুল রিসর্ট। এই রিসর্টটি নিয়েই উঠছে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ— সরকারি জমি দখল, বেআইনি নির্মাণ, ইজারা নিয়ে অনিয়ম থেকে শুরু করে কোটি টাকার ব্যবসা করেও সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা না পড়া ইত্যাদি।
‘সঞ্চারী’ নামে ওই বিলাসবহুল রিসর্টে এখন কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বিত্তশালী পর্যটকরা অবসর কাটাতে আসেন। সুইমিং পুল থেকে শুরু করে আধুনিক অতিথিশালা সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর চোখে এটি এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিক রিসর্ট। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি খাসজমিতে কীভাবে এমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল?
জেলা পরিষদের সভাধিপতি তথা হাসন বিধানসভার বিধায়ক কাজল শেখও এই অভিযোগ তুলছেন। তিনি জানান, জেলা পরিষদের অর্থে একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে বৃদ্ধাশ্রমটি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পরে সেই জায়গায় রিসর্ট গড়ে ওঠে। আমি সভাধিপতি হওয়ার পর দেখেছি, আড়াই বছর ধরে জেলা পরিষদের তহবিলে কোনো রাজস্ব জমা পড়েনি। সরকারি খাসজমিতে কীভাবে বাণিজ্যিক রিসর্ট চালানো হচ্ছে, তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই জেলাশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। কারণ খাসজমির দেখভালের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। তাঁর কথায়, তদন্ত হলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। অন্যদিকে রিসর্ট ‘সঞ্চারী’র কর্ণধার রবীন্দ্রনাথ রায় জানান, আমাকে সরকারি ভাবেই দেওয়া হয়েছে। আমি নিয়েছি। এর বেশি প্রশাসন বলতে পারবে। কিন্তু এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় বাসিন্দারা। বল্লভপুরডাঙার বাসিন্দা বিজয় মার্ডি ও শংকর সরেন বলেন, প্রথমে গরিব বৃদ্ধদের রাখার জন্য ঘর হয়েছিল। পরে একে একে সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এখন সেখানে বাবুদের রিসর্ট চলছে। সরকারি জমিতে ব্যবসা করে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় হলেও সরকারি কোষাগারে একটি টাকাও রাজস্ব বাবদ জমা পড়ে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তৎকালীন জেলা পরিষদ সভাধিপতি বিকাশ রায়চৌধুরী ও পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ আব্দুল কেরিম খানের আমলে নানুর বাসাপাড়ার একটি সংস্থাকে ইজারা দেওয়া হয়েছিল ওই প্রকল্প। পরে সেটি বোলপুরের অন্য এক সংস্থার হাতে যায় বলে অভিযোগ। যদিও পুরো প্রক্রিয়া কতটা আইনসিদ্ধ ছিল, তা নিয়েই এখন প্রশ্নের ঝড়।
এদিকে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই তৃণমূল আমলের একাধিক দুর্নীতি, বেআইনি নির্মাণ ও সরকারি সম্পত্তি বেহাতের অভিযোগ সামনে আনছে বিজেপি নেতৃত্ব। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে জেলা নেতৃত্ব সবাই এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। শান্তিনিকেতনের ওই বৃদ্ধাশ্রমের রিসর্টে পরিণত হওয়ার ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে আরও বড় জায়গায়, যে জমি ছিল অসহায় প্রবীণদের আশ্রয়ের জন্য, সেখানে আজ বিলাসবহুল পর্যটন ব্যবসা চলছে কীভাবে? সরকারি খাসজমিতে নির্মাণের অনুমতি মিলল কার নির্দেশে? জেলা পরিষদের অর্থে তৈরি সম্পত্তির আয় গেল কোথায়? আর যদি সবই বৈধ হয়, তবে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা পড়ল না কেন?
শান্তিনিকেতনের পর্যটন মানচিত্রে ‘সঞ্চারী’ এখন পরিচিত নাম। কিন্তু তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই জমি ও বৃদ্ধাশ্রমের রহস্য ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বোলপুর-শান্তিনিকেতন জুড়ে। এখন নজর প্রশাসনের দিকে তদন্তে কি সামনে আসবে আরও বড় কোনো চক্র?