• পালাবদল হতেই ডিটেনশন ক্যাম্প বঙ্গে
    বর্তমান | ২৫ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যে পালাবদল হতেই ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ তৈরির তৎপরতা শুরু। বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের ডিটেক্ট করার পর ‘ডিপোর্টেশনে’র আগের চূড়ান্ত পর্ব। ইতিমধ্যে এই বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সব জেলাশাসকের কাছে চিঠি চলে গিয়েছে। তাতে অবশ্য ডিটেনশন শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। তার বদলে লেখা হয়েছে ‘ডিপোর্টেশন’। আর জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির। যে সব বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়বে, তাদের রাখা হবে সেখানেই। অনুপ্রবেশের দায়ে জেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ‘বিদেশি’দেরও এখানেই রাখার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে। এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা গত বছরের ২ মে তারিখের একটি বিজ্ঞপ্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রকের গাইডলাইন অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে রাজ্য সরকার।

    অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের আটক করে ‘ডিটেনশন সেন্টারে’  রাখা এবং তারপর পুশব্যাকের বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই চরম বিতর্ক চলছে। অসমে এনআরসি করতে গিয়ে চিহ্নিত বেশ কিছু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে এই জাতীয় ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের আটকে রাখার জন্য বিশেষ জায়গা তৈরি করতে গত অন্তত ৫-৬ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলিকে চাপ দিয়ে এসেছে।  পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ডিটেনশন সেন্টার রাজ্যে কোনো অবস্থাতেই  তৈরি করা হবে না।

    কিন্ত রাজ্যে পালাবদলে বিজেপি ক্ষমতায় আসা মাত্র পরিস্থিতি আমূল পালটে গিয়েছে। নির্বাচনি প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতা ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এরাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে পুশব্যাকের ঘোষণা করেছিলেন। কারণ, ‘ঘুসপেট’ ছিল বিজেপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনি ইস্যু। দলের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, হিন্দু সহ ৬টি ‘অ-মুসলিম’ সম্প্রদায়ের যাঁরা বেআইনিভাবে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাঁরা কেন্দ্রীয় সিএএ আইনে আবেদন করে বৈধ নাগরিকত্ব পাবেন। তাঁদের কিন্তু অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হবে না। তাঁরা হবেন শরণার্থী। কিন্তু  ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ এদেশে থাকতে দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রী এই প্রসঙ্গে একাধিকবার ‘ডিটেক্ট-ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক গ্রাস করেছে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ‘অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় ঝুলে থাকা ২৭ লক্ষ বঙ্গ ভোটারকে। বর্তমান শাসক দলের অভিযোগ, এঁদের অধিকাংশই অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের কি এই ডিপোর্টেশন সেন্টারে ঠেলে দেওয়া হবে। যদিও সূত্রের খবর, যেহেতু এই ভোটারদের আবেদন এই মুহূর্তে বিচারাধীন, নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যেমন কোনো সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না, তেমনই তাঁদের ‘আটক’ও করা হবে না।

    বিএসএফ কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ সীমান্তে ফেন্সিং গড়ার জন্য জমি দেওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘কোনো বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লে এখন থেকে পুলিশ আর তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠাবে না। সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে ফেরত পাঠানোর জন্য।’ প্রশাসনিক মহল মনে করছে, অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে কেউ ধরা পড়লে প্রথমে তাকে এই ডিটেনশন বা হোল্ডিং ক্যাম্পেই কিছুদিন রেখে পরিচয় যাচাই করা হবে। ওই ব্যক্তি যে অনুপ্রবেশকারী সেটা প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত করার পর বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তারপর হবে সীমান্ত পার। ডিপোর্টেশন। আর শেষে ‘ডিলিট’। দেশ থেকে।
  • Link to this news (বর্তমান)