এই সময়, শিলিগুড়ি: দু'দিন আগের কথা। শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন সুস্মিতা মজুমদার। দোতলায় উঠতে গিয়ে আচমকা থমকে দাঁড়ান তিনি। সিঁড়ির কোণে রাখা ফুটফুটে শিশুর ছবির গাল বেয়ে নেমে এসেছে লালচে দাগ। কাছে গিয়ে দেখেন, পানের পিক। 'ইস... এত সুন্দর বাচ্চাটার ছবিতে কেউ পান-গুটখার পিক ফেলে'- নিজের মনেই বলে ওঠেন প্রধাননগরের বাসিন্দা সুস্মিতা। হাসপাতালের এক মহিলা নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে বললেন, 'একটু চোখের আড়াল হলেই কেউ না কেউ দেওয়ালে, সিঁড়িতে, ছবির উপরে পান-গুটখার পিক ফেলে নোংরা করছে। বকাঝকা করলে উল্টে ঝামেলা করে।' সরকারি হাসপাতালের সাদা দেওয়াল নোংরা করাটায় যেন এখন দস্তুর। বহির্বিভাগ থেকে লেবার রুমের করিডর, পুরুষ ও মহিলা সার্জিক্যাল ওয়ার্ড সব জায়গায় একই ছবি।
যেখানে সেখানে পিক ফেলার প্রবণতা ঠেকাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বছর খানেক আগে অভিনব উপায় বের করেন। সিঁড়ির কোণ, করিডর, দেওয়ালের পাশে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল শিশুদের হাসিমুখের ছবি। কোথাও ছোট্ট মেয়ের বড় বড় চোখ, কোথাও আবার সদ্যোজাত শিশুর ঘুমন্ত মুখ। উদ্দেশ্য একটাই-মানুষ অন্তত ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থুতু, পিক ফেলতে সংকোচ বোধ করবে। প্রথমদিকে কাজও হয়েছিল। হাসপাতাল সুপার চন্দন ঘোষ বলেন, 'শুরুতে অনেকটাই কমেছিল। রোগীর আত্মীয়রা শিশুর ছবির উপরে পিক ফেলতে সংকোচ করত। কিন্তু ধীরে ধীরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।' তাঁর সংযোজন, 'এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে, হাসপাতালের কয়েকটি অংশে প্রায় একদিন অন্তর রং করাতে হচ্ছে।'
হাসপাতালের ভেতরে ঘুরলে বোঝা যায়, পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করতে কতরকম চেষ্টা চলছে। আলাদা ডাস্টবিন রাখা হয়েছে-একটিতে সাধারণ আবর্জনা, অন্যটিতে পানের পিক বা গুটকার বর্জ্য ফেলার জন্য। তবু অনেকেই কয়েক পা হাঁটার প্রয়োজন বোধ করেন না। ইমারজেন্সির পাশে পাহারায় থাকা এক নিরাপত্তারক্ষীর কথায়, 'ডাস্টবিন সামনে, অথচ অনেকে মাটিতে পিক ফেলেন। বাধা দিলেই অশান্তি। আমাদেরই কফ-থুতু-পানের পিক পরিষ্কার করতে হয়।' নার্সিংহোম বা নিজের বাড়িতে কেউ এমন করে কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকদের একাংশ। সেই কারণে রোগী ও পরিজনদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন হাসপাতালের সুপার।
সরকারি হাসপাতাল এমন এক জায়গা, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসেন উদ্বেগ নিয়ে, অসুস্থ সন্তানকে সুস্থ করতে। যে শিশুর হাসিমুখ কষ্ট ভুলিয়ে দেয়, সেই ছবিতে পানের পিক অসচেতনতা না উদাসীনতা, বোঝা দায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাইলেই জরিমানা ধার্য করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, এমনটাই মত অনেকের। আজ, সোমবার শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালে রোগী কল্যাণ সমিতির মিটিং রয়েছে। সেখানে এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে চান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।