• দ্বিতীয় স্থানে বাংলায় অক্সিজেন খুঁজছে সিপিএম!
    আজকাল | ২৫ মে ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ’, বরং বলা যেতে পারে নতুন শুরু। নুইয়ে পড়া লাল পতাকায় ফের উত্তাল হাওয়া লাগল 'সামান্য়' একটা পুনর্নির্বাচনকে ঘিরে। নিঃসন্দেহে বলাই যায়, পুনর্নির্বাচনকে ঘিরে এ যেন এক পুনরুত্থানের গল্প। যার কেন্দ্রে একটাই নাম-'সিপিআইএম', আর যাঁর কাঁধে ছিল সেই লাল পতাকাকে ফের বাংলার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করে তোলার ভার, তিনি শম্ভুনাথ কুড়মি। হতে পারে ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় স্থান পেলেন, বিজেপির জয়ী প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডার থেকে পিছিয়ে রইলেন লক্ষাধিক ভোটে, কিন্তু তাতে কী, গুরুত্ব বিচার করলে এই দ্বিতীয় হওয়া প্রথম স্থানের থেকেও কোনও অংশে কম নয়। অন্তত 'শূন্য়' থেকে 'এক' হওয়া বামেদের কাছে। কারণ এই একটি ফলেই যেন লুকিয়ে আছে বাংলার রাজনীতির আগামীর রূপরেখা। শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পরিসরে কি এবার লাল ব্রিগেডই জায়গা পেয়ে গেল তবে? স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গেল ফলতা। অভিষেক ব্যানার্জির 'ডায়মন্ড হারবার মডেল' যেদিন ভেঙে খানখান হয়ে গেল, সেদিনই প্রায় ২০% ভোট নিয়ে বামেদের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি বামেদের সেই হারিয়ে যাওয়া ভোট ব্য়াঙ্কের কাছে। 

    ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনের ফল শুধু বিজেপির বিপুল জয়ের জন্য নয়, বামেদের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসার কারণেও রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন পর কোনও বড় নির্বাচনে সিপিএম দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসে বুঝিয়ে দিল, বাংলার রাজনীতিতে তাদের সংগঠন ও ভোটব্যাঙ্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং তৃণমূলের দুর্বলতার সুযোগে বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এই পুনর্নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা পেয়েছেন ১,৪৯,৬৬৬ ভোট (৭১.২%)। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই(এম)-এর শম্ভুনাথ কুড়মি পেয়েছেন ৪০,৬৪৫ ভোট (১৯.৩৪%)। কংগ্রেস প্রার্থী আবদুর রাজ্জাক মোল্লা পেয়েছেন ১০,০৮৪ ভোট (৪.৮%)। অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান পেয়েছেন ৭,৭৮৩ ভোট (৩.৭%)। বিজেপির জয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১,০৯,০২১ ভোটে।

    এই ফলাফলে রাজনৈতিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি বামেদের দ্বিতীয় হওয়াকে ঘিরেই। কারণ সংখ্যার বিচারে বিজেপির থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও সিপিআই(এম) তৃণমূল এবং কংগ্রেস— দু’পক্ষকেই পিছনে ফেলে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এমন এক সময়ে এই ফল উঠে এল, যখন রাজ্য রাজনীতিতে বামেদের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠছিল। ফলে ৪০ হাজারের বেশি ভোট পাওয়া বামেদের কাছে শুধুই ভোটসংখ্যা নয়, সংগঠনের পুনরুজ্জীবনের বার্তাও।

    ফলতা পুনর্নির্বাচনের পটভূমিও ছিল যথেষ্ট উত্তপ্ত। অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন আগের ভোট বাতিল করে নতুন করে ২৮৫টি বুথে ভোটগ্রহণের নির্দেশ দেয়। পুনর্নির্বাচনে ভোটের হারও ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে এই ফলকে শুধুমাত্র নির্বাচনী পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, বরং জনমতের নতুন ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বাম নেতৃত্ব প্রকাশ্যে বড় দাবি না করলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ফলতার এই ফল ভবিষ্যতের লড়াইয়ে সিপিআই(এম)-এর কাছে ‘মরাল বুস্টার’ হতে পারে। বিজেপির বড় জয়ের আড়ালেও তাই ফলতার রাজনৈতিক গল্পে আলাদা করে উঠে আসছে আরেকটি তত্ত্ব, হারলেও দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিল বামেরা।

    আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, একাধিক বুথে বিজেপিকে টেক্কা দিয়ে প্রথম স্থানেও উঠে এসেছে সিপিএম। বাম নেতৃত্বের দাবি, এটা শুধুমাত্র একটি উপনির্বাচনের ফল নয়, বরং আগামী দিনের রাজনীতির ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন পরে বাম কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও এই ফল নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। ইতিমধ্যেই রাজ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে ফলতার ফলাফল নিয়ে। কারণ আচমকাই সিপিএম-এর উত্থান রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতই ঘটনা তো বটেই। যদিও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনুমান এই ফলাফলই হওয়ার ছিল। ভোট বিশেষজ্ঞদের কথায় ফলতার জনবিন্যাসের কারণেই এই ফলাফল। ফলতায় মুসলিম সম্প্রদায় প্রায় ৩০%। সেই সংখ্যালঘু ভোট ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের বাঁধা ভোট ব্য়াঙ্ক। কিন্তু এবার তৃণমূল হারতেই রীতিমতো ডুমুরের ফুল হয়ে গিয়েছেন ঘাস-ফুল শিবিরের নেতারা। 'ভোট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি' বলে সেই যে বিদায় নিলেন 'পুষ্পা' জাহাঙ্গীর, আর খোঁজই মিলল না তাঁর। ফলে ভোটারদের ভরসাও হারাল ঘাসফুল শিবির। 

    ফলতায় হিন্দু ভোট ৭০%। সেই ভোট একজোট হয়ে গেলে, যার ভাগে তা যাবে, তাদের জয় নিশ্চিত। সেই অঙ্কেই ফলতায় এবার বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে বিজেপি। কিন্তু সংখ্যালঘুদের যে ভোট এতদিন তৃণমূলের বাধা ছিল, তা ঘুরে গিয়ে পড়তে শুরু করেছে সিপিএম-এর ঝুলিতে। ফলতা নির্বাচনের আগে থেকেই বাম আর কংগ্রেসের নজরে ছিল সংখ্যালঘু ভোট। আর সেই সংখ্যালঘুদের নিজেদের দিকে ফেরাতে সক্ষম হল বামেরা। তাতেই তাদের দ্বিতীয় স্থান। তাই ফলতার ফল যেন নতুন করে বেঁচে ওঠা এক দলের গল্পও হয়ে রইল। 

    ফলতার ফলাফল দেখে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, “বিজেপির মতো শক্তি পশ্চিমবঙ্গে মাথা তোলার পরে তৃণমূলকে যখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন মানুষ, বিশেষত সংখ্যালঘুরা নিজেদের ভরসার জায়গা নিজেরাই খুঁজে নিচ্ছেন।'' আর যিনি এই অসাধ্যসাধন করলেন, সেই শম্ভুনাথ কুড়মি শেষ বেলায় বলে গেলেন, 'আগামীতে আর ফলতার বুকে কোনও জাহাঙ্গীর তৈরি হবে না। আমরা থাকব মানুষের পাশে।' সেই মানুষও কি ফের পাশে চাইছে 'হারিয়ে' যাওয়া বামেদের পাশে? ইঙ্গিত কিন্তু স্পষ্ট।
  • Link to this news (আজকাল)