Assam Model In North Bengal Tea Gardens: ধুঁকতে থাকা উত্তরবঙ্গের চা বলয়কে চাঙ্গা করতে এবার প্রতিবেশী রাজ্যের সফল ‘অসম মডেল’ (Assam Model) বাস্তবায়নের মেগা পরিকল্পনা নিল রাজ্য সরকার। সম্প্রতি শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে চা বলয়ের বিজেপি সাংসদ ও বিধায়কদের অসমে গিয়ে সেখানকার পরিকাঠামো সরেজমিনে দেখে আসার কড়া নিদান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর এই সবুজ সংকেত মিলতেই টি বোর্ডের (Tea Board) আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে পাহাড়, ডুয়ার্স ও তরাইয়ের জনপ্রতিনিধিরা গুয়াহাটি যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। আর এই মহাজাগতিক ডামাডোলের মধ্যেই বছরের পর বছর বঞ্চনার শিকার হওয়া উত্তরবঙ্গের লক্ষাধিক চা শ্রমিক এবার বুক বাঁধছেন নতুন আশায়।
ঠিক কী এই ‘অসম মডেল’?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মডেলের মূল স্তম্ভ দুটি, প্রথমটি সরাসরি শ্রমিককল্যাণ সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয়টি সামগ্রিক চা শিল্পকেন্দ্রিক। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পাঠানো কোটি কোটি টাকায় অসমে চা শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা হয়েছে। মূলত জোর দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও শিক্ষা খাতের ওপর। কেন্দ্রের এই বিশেষ প্রকল্পটির নাম ‘চা শ্রমিক প্রোৎসাহন যোজনা’। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রকল্পের আওতায় পশ্চিমবঙ্গের চা বলয়ের জন্যও মোটা টাকা বরাদ্দ হলেও, এখানে প্রকল্প রূপায়ণের মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ ‘স্টেট লেভেল কমিটি’-ই এতদিন গঠন করা হয়নি! আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কেন্দ্রের সেই বিপুল টাকা এ রাজ্যে অলসভাবে পড়ে রয়েছে। আর দেরি নয়, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা দ্রুত সাংসদ-বিধায়করা অসমে যাচ্ছি। তার আগে টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারপার্সন সি মুরুগানের সঙ্গে আমাদের একটি চূড়ান্ত বৈঠক হবে। এই টাকাকে কাজে লাগিয়ে উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের ভাগ্য ফেরানোই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”
এক হাজার কোটির বাজেট ও রূপায়ণের চালচিত্র
প্রসঙ্গত, ২০২১-’২২ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন অসম ও উত্তরবঙ্গের চা বাগানের মহিলা ও শিশুদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য মোট ১ হাজার কোটি টাকার এক ঐতিহাসিক তহবিল ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রকের মাধ্যমে অসমের জন্য ৬৮৪ কোটি এবং উত্তরবঙ্গের জন্য ৩১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ২০২৪-’২৫ ও ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে এই টাকা খরচের ডেডলাইন দেওয়া হলেও পরে কেন্দ্রের তরফে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬-’২৭ করা হয়েছে। অসম সরকার ইতিমধ্যেই তাদের প্রাপ্ত টাকা ডিব্রুগড় চা বাগানের মতো একাধিক জায়গায় পাইলট প্রজেক্ট বা ‘ওয়েলফেয়ার প্রোজেক্ট’ হিসেবে খরচ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
অসমে চালু হওয়া ‘স্বাস্থ্যবান শ্রমিক যোজনায়’ দেওয়ান, জুটলিবাড়ি, মোরান, সেসসা ও ঘাগরাজানের মতো বাছাই করা বাগানে চালু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল ইউনিট (Mobile Medical Unit)। এর মাধ্যমে শ্রমিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিশুরোগ ও পুষ্টির জোগান, ডায়াবিটিস, যক্ষ্মা ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যের চিকিৎসা। এমনকি তামাক ও মদের মারাত্মক আসক্তি কাটাতেও সেখানে সরকারি স্তরে কাউন্সেলিং চলছে। শিক্ষার প্রসারে জোর দেওয়া হয়েছে বাগানের স্কুলগুলির ভোলবদল, বন্ধ বাগানের পড়ুয়াদের এককালীন আর্থিক সাহায্য এবং স্কলারশিপের ওপর। এছাড়া ‘আবাস যোজনা’র মাধ্যমে শ্রমিকদের ঘরবাড়ি মেরামত, নতুন পাকা বাড়ি, শৌচালয় ও পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অসমে গর্ভবতী চা শ্রমিক মায়েরা পাচ্ছেন এককালীন ১২ হাজার টাকার সরকারি সাহায্য এবং ভোটের আগে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে ৫ হাজার টাকা।
জমির অধিকার ও উত্তরবঙ্গের প্রত্যাশা
সাংসদ মনোজ টিগ্গা আরও একটি বড় বিষয় সামনে এনেছেন। তিনি জানান, “অসমের চা শ্রমিকরা তাঁদের জমির পূর্ণ অধিকার বা পাট্টা পেয়েছেন। এবার আমাদের উত্তরবঙ্গের চা বলয়েও শ্রমিকদের এই জমির অধিকার দেওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হবে।” বর্তমান সরকারের এই মাস্টারস্ট্রোককে স্বাগত জানিয়েছে উত্তরের চা শ্রমিকদের যৌথ মঞ্চ ‘জয়েন্ট ফোরাম’-ও। তাঁরাও এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। খোদ মুখ্যমন্ত্রী যখন নিজে এই উদ্যোগ নিয়েছেন, তখন আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। বড় বাগানের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র চা চাষিদের কথাও রাজ্য সরকার ভাববে, এই বিশ্বাস আমাদের রয়েছে।”