‘জাতীয় দলে সুযোগ না পেলে মনখারাপ তো হবেই’, আইএসএল জিতেও অভিমানী ইস্টবেঙ্গলের গিল
প্রতিদিন | ২৬ মে ২০২৬
অনেকে মনে করেন, ডার্বির দিন ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার প্রভসুখন গিলের বাঁ পা শেষ মুহূর্তে মার্টিনেজের বাঁ পা হয়ে না উঠলে, লাল-হলুদের আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সেখানেই গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটত। এহেন ইস্টবেঙ্গল দুর্গের শেষ প্রহরী এই মুহূর্তে লুধিয়ানায় নিজের গ্রামে আরাম করে ছুটি কাটাচ্ছেন। এদিন যখন ফোনে ধরা গেল, গলা শুনে মনে হল, বিশাল যুদ্ধ শেষ করে ছাউনিতে এসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
প্রশ্ন: লুধিয়ানার কোন গ্রামে থাকেন আপনি ?
গিল: গুরু নানক স্টেডিয়াম থেকে প্রায় আধ ঘন্টা দূরে ‘সারাভা’ বলে একটি গ্রাম আছে। সেখানেই বাবা-মা, দাদা-বৌদির সঙ্গে থাকি।
প্রশ্ন: সারাভা গ্রাম মানে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তী বিপ্লবী কর্তার সিং সরাভার গ্রাম? ভগত সিং যাঁর ছবি সব সময় কাছে রেখে দিতেন?
গিল: হুম। আমাদের গ্রামকে বিপ্লবীদের গ্রাম বলা হয়। কর্তার সিং সারাভা মাত্র ১৯ বছর বয়সে ব্রিটিশদের হাতে ফাঁসিতে শহীদ হন।
প্রশ্ন: তাই বোধহয়, বারপোস্টের নীচে এরকম অকুতোভয় চিত্তে দাপিয়ে বেড়ান?
গিল: (হেসে উঠে) এটা ঠিক যে, কোনও কিছুতে ভয় পাই না। মাঠে যখন নামি, আগে থেকে ভাবি না, ম্যাচটা হারব না জিতব? সব সময় মাথায় থাকে, নিজের সেরাটা দিতে হবে। এটা বলতে পারি, নিজেকে সব সময় পজিটিভ রাখি। মনের মধ্যে কখনও নেগেটিভ কিছু ভাবনা আসতে দিইনি। আর যারা নেগেটিভ আলোচনা করে, তাঁদের এড়িয়ে চলি।
প্রশ্ন: কোচ অস্কার কী করেন?
গিল: ওরে বাবা। তিনি তো ভয়ঙ্কর পজিটিভ একজন মানুষ। প্রথম দিন থেকে ড্রেসিংরুমের মধ্যে এই পজিটিভ ভাবনাটা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম, আমরা আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হব। শুধু কোচ বা আমরা ফুটবলার নয়, আমাদের বল বয়, মিডিয়া টিম সব্বাই একটা জিনিস বিশ্বাস করতাম, আমরা চ্যাম্পিয়ন হবই।
প্রশ্ন: কিন্তু গত মরশুমেও যে দলটাকে ঘিরে সমর্থকদের সবচেয়ে বড় আশা ছিল, প্রথম ছ’য়ে থাকতে পারলেই বিশাল ব্যাপার হয়ে যাবে। সেখান থেকে একদম চ্যাম্পিয়ন ?
গিল: আমাদের এবারের দলটা সত্যিই খুব ভাল দল। শুরুটাও দারুণ হয়েছিল। মাঝে কিছু পয়েন্ট হারিয়ে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল। তবে বেঙ্গালুরু ম্যাচে ১০ জনে খেলে ম্যাচে ফিরে আসার পর মনে হয়েছিল, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো জায়গায় আমরা আছি। সবাই মিলে চেষ্টা করলে সম্ভব। এই মরশুমে আমাদের সুপার কাপটাও জেতা উচিত ছিল।
গিল: দেখুন, বাইরে কি ঘটছে আমরা কোনওদিন ড্রেসিংরুমে ঢুকতে দিইনি। বাইরে যা খুশি হোক, আমরা সবাই আরও বেশি করে ফোকাস করেছি, ম্যাচ জেতার জন্য।
প্রশ্ন: কিন্তু অস্কার যখন মুম্বই ম্যাচের আগে জানালেন, পরের মরশুমে কোচ না-ও থাকতে পারেন, তখন নিশ্চয়ই ড্রেসিংরুমে প্রভাব ফেলার যথেষ্ট কারণ ছিল?
গিল: একদমই নয়। কোচ তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত নিয়ে কিছু বলেছিলেন। তার সঙ্গে ড্রেসিংরুমে প্রভাব পড়বে কেন? এরপরেই তো মুম্বই ম্যাচ জিতি। ততক্ষণে আমরা সবাই একটা জিনিস বুঝে গিয়েছি, চ্যাম্পিয়নশিপের কাছাকাছি এসে গিয়েছি। এই জায়গা থেকে আর পিছনে ফিরে তাকানোর কোনও প্রশ্নই নেই।
প্রশ্ন: শেষ তিন ম্যাচের মধ্যে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে গোল লাইনে দাঁড়িয়ে একটা হ্যান্ডশেক দূরত্ব থেকে আসা শট বারের উপর থেকে তুলে দিয়েছেন। মোহনবাগান ম্যাচে জেমি ম্যাকলারেনের শট শরীর ছুঁড়ে আর্জেন্টিনার গোলকিপার মার্টিনেজের মতো আটকেছেন। এমনকী শেষ ম্যাচে ছোট বক্সের ভিতর থেকে একাধিকবার ইন্টার কাশীর ফুটবলারদের শট আটকেছেন।
গিল: উফ। আর মনে করাবেন না। ঘুমের ঘোরেও পরিস্থিতিগুলি মনে পড়লে বিছানায় উঠে বসি। এখন আনন্দে কাটাতে চাই। ওই টেনশনের পরিস্থিতিগুলি আর মনে আনতে চাইছি না।
প্রশ্ন: তবুও ম্যাকলারেনের শট বাঁচানোর মুহূর্তটা জানতে ইচ্ছে করছে।
গিল: ম্যাকলারেনের কাছে যখন সেন্টারটা আসছে, আমি একটা আন্দাজ করে গোল অ্যাঙ্গেলটা ছোট করছিলাম। জানতাম, এমন জায়গায় ম্যাকলারেন বল পাচ্ছে, যেখান থেকে নিশ্চিত গোল। তবুও চেষ্টা করছিলাম, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলের উপর নজর রাখতে। বাকিটা অনুমান ক্ষমতায় হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার প্রিয় গোলকিপার কে, মার্টিনেজ ?
গিল: না। বুঁফো।
প্রশ্ন: ভারতীয় পর্যায়ে?
গিল: কেউ নেই।
প্রশ্ন: আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিয়েছেন। গ্রামে নিশ্চয়ই প্রচুর সংবর্ধনা পাচ্ছেন?
গিল: দেখুন, কলকাতার সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। আমার কাজিনরা যা একটু উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। ওরা ডার্বি দেখতে কলকাতাতেও গিয়েছিল। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দু’দিন তো কলকাতায় ছিলাম, এরকম অভিজ্ঞতা কোনওদিন হইনি। আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সমর্থকদের যে পাগলামি দেখেছি, এরকমটা কোনওদিন দেখিনি। আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত।
প্রশ্ন: এরকম অসাধারণ পারফরম্যান্স করে দলকে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন করার পরেও কিন্তু জাতীয় দলে সুযোগ পেলেন না আপনি। মন খারাপ হয় না?
গিল: দেখুন, মিথ্যে কথা বলব না। জাতীয় দলে সুযোগ না পেয়ে অবশ্যই মন খারাপ হয়। দেশের হয়ে ফুটবল মাঠে লড়াই করব। তারজন্যই তো ফুটবল খেলি। আমাদের গ্রামে প্রচুর মানুষ দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছে। আর আমি ফুটবল মাঠে দেশকে জেতানোর জন্য লড়ব, এটাই তো স্বপ্ন। সুযোগ না পেলে মন খারাপ হয়। কিন্তু ভেঙে পড়ছি না। আরও ভাল পারফরম্যান্স করব। একদিন না একদিন ঠিক সুযোগ পাব।