• উত্তর-মধ্য হাওড়া থেকে সাঁকরাইল, হাতকড়া পরিয়ে ‘ডন’দের প্যারেড
    বর্তমান | ২৬ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: এক সময় যাদের ত্রাসে মুখ খোলার সাহস পেতেন না এলাকার বাসিন্দারা, এখন তাদেরই দেখা গেল স্যান্ডো গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট আর হাতকড়ায় বন্দি অবস্থায় পুলিশের ঘেরাটোপে রাস্তায় হাঁটতে। মাথা ন্যাড়া, পরনে কার্যত অন্তর্বাসসদৃশ পোশাক। যেন এলাকার ‘ডন’ নয়, বরং ভাগ্যের নির্মম ব্যঙ্গচিত্র। এই দৃশ্য দেখতে রাস্তায় তখন উপচে পড়া ভিড়। জনতার মুখে একের পর এক টিটকিরি— ‘মস্তান এখন ভিজে বিড়াল’, ‘অদৃষ্টের কী পরিহাস!’ উত্তর ও মধ্য হাওড়ার দুই কুখ্যাত দুষ্কৃতী আকাশ সিং ও শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে’কে নিয়ে কার্যত এমনই ‘দাবাং’ মেজাজে রাস্তায় নামল হাওড়া সিটি পুলিশ। সাঁকরাইলের রাস্তায় ধৃত হোমগার্ডকে কোমরে দড়ি পরিয়ে হাঁটাল পুলিশ।

    রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগান তুলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই অপরাধ দমনে পুলিশকে কার্যত ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক মহলের দাবি। তারই প্রতিফলন এখন হাওড়ার রাস্তায়। রাজনৈতিক তোলাবাজি থেকে দখলদারি, হিংসা থেকে বোমাবাজি— বিগত সরকারের প্রশ্রয়ে মাথাচাড়া দেওয়া একের পর এক অভিযুক্তকে শ্রীঘরে পাঠাতে শুরু করেছে পুলিশ। গত ১৪ মে মালিপাঁচঘড়া থানার পুলিশ ধর্মতলা রোড থেকে গ্রেপ্তার করে আকাশ সিংকে। খুন, বোমাবাজি, দখলদারি, বেআইনি অস্ত্র মজুত সহ ২২টিরও বেশি অপরাধমূলক ঘটনায় নাম জড়িয়েছে তার। বামনগাছিতে পুলিশের উপর গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানার শ্যুটআউটেও নাম জড়ায় আকাশের। পুলিশের একাংশের অভিযোগ, উত্তর হাওড়ার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের ছত্রছায়ায় থাকায় এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল সে। গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারীরা গত দু’দিন ধরে আকাশকে নিয়ে মালিপাঁচঘড়া ও গোলাবাড়ি থানার একাধিক ‘ক্রাইম সিন’ ঘুরে দেখেন। পরে কিংস রোড, ধর্মতলা রোড ও এসি মার্কেট এলাকায় তাকে রাস্তায় হাঁটানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ‘নিজেকে ডন বলে পরিচয় দিত আকাশ। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলত না। এতদিনে পুলিশ সত্যিকারের পুলিশের মতো কাজ করেছে।’ যদিও পুলিশের দাবি, অতিরিক্ত গরমের কারণেই অভিযুক্ত নিজেই চুল-দাড়ি কেটে হালকা পোশাক পরতে চেয়েছিল।

    গত ২১ মে মুম্বই থেকে ধৃত চরা বস্তির কুখ্যাত দুষ্কৃতী শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে’কে রবিবার পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিল হাওড়া আদালত। এদিন বিকালে ধৃতকে একই কায়দায় স্যান্ডো গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট, হাতকড়া পরানো অবস্থায় শিবপুর ট্রামডিপো থেকে চরা বস্তি পর্যন্ত প্যারেড করায় পুলিশ। ঘটনার পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি ধৃতকে নিয়ে যাওয়া হয় তার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটেও। পাশাপাশি, শনিবার সাঁকরাইল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া অস্থায়ী হোমগার্ড শাহিন মোল্লা ওরফে সানিকেও এদিন কোমরে দড়ি বেঁধে এলাকায় ঘোরানো হয়। অভিযোগ, সাঁকরাইলের বিধায়কের মদতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় তোলাবাজি, প্রভাব খাটানো ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেড়াত সে। রাজনৈতিক মদতে বেড়ে ওঠা এই ‘দাপুটে’ মুখগুলিকে এদিন পুলিশি পাহারায় রাস্তায় হাঁটতে দেখে ক্ষোভ উগরে দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উত্তর হাওড়ার বিজেপি বিধায়ক উমেশ রাই বলেন, ‘এই গুন্ডা-দুষ্কৃতীদের ব্যবহার করে এতদিন এলাকায় সন্ত্রাস ছড়ানো, তোলাবাজি করত তৃণমূল। জঙ্গলরাজ খতম। হাওড়ার রাস্তায় আর কোনো রং-বাজদের দেখা যাবে না।’
  • Link to this news (বর্তমান)