জিআই ট্যাগ, বিদেশে রফতানি সত্ত্বেও মাসের শেষে পকেটে ফাঁকা, গরদ শিল্পে অনীহা বাড়ছে তাঁতিদের
News18 বাংলা | ২৬ মে ২০২৬
জিআই ট্যাগ মিলেছে। বিদেশেও রফতানি হয়। তবু সরকারি অনীহায় ধুঁকছে মুর্শিদাবাদের মির্জাপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরদ শিল্প। এক সময় যে গ্রামে সাতশোর বেশি তাঁত চলত, আজ সেখানে সচল তাঁতের সংখ্যা মাত্র ৩২০। কারণ, মুনাফা না থাকায় মুখ ফেরাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন মির্জাপুরের গরদ শিল্পীরা। প্রসঙ্গত, গরদ শাড়ি হল মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত সিল্ক শাড়ি। একে ‘গরদ’ বলা হয় কারণ এটি খাঁটি রেশম সুতোয় বোনা। কোনওরকম জরি বা রঙিন সুতো মেশানো হয় না এতে। সাধারণত সাদা বা অফ-হোয়াইট জমিনের ওপর লাল পাড়ে ও আঁচলে সরু রঙিন সুতোর বর্ডার থাকে।
যদিও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে গরদ সিল্কে এসেছে নতুনত্ব। এখন মেরুন এবং নীল রঙের রেশম সুতো দিয়েও বোনা হচ্ছে গরদ শাড়ি। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে গরদ বোনা শুরু হয় ১৯ শতকের শেষ দিকে। মুর্শিদাবাদ জেলার মির্জাপুর গ্রামে প্রথম এই শাড়ি বোনেন তাঁতি মৃত্যুঞ্জয় সরকার। তখন থেকেই এটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। মির্জাপুরের শশাঙ্কশেখর গম্ভীরা, মনোরঞ্জন পোস্তি, শ্যাম সাহানা ও মনীন্দ্র বীরো গরদ বুননে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পান। শোনা যায়, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডু একসময় শুধু শ্যাম সাহানার বোনা গরদ শাড়ি পড়তেন। এমনকি ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও নিয়মিত মির্জাপুর থেকে গরদ কিনতেন।
এইরকমই ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুরের গরদ শাড়ি ২০২৪ সালে জিআই ট্যাগ পায়। বর্তমানে এই শাড়ি বিদেশে রফতানি হয়। তন্তুজ, মঞ্জুষার মতো বড় বড় দোকানেও মির্জাপুরের গরদের চাহিদা রয়েছে। তবু শিল্পীদের অভিযোগ, সরকারি অনুদান বা সহায়তা মেলে না। শিল্পী পলাশ মুনিয়া বলেন, “জিআই ট্যাগ পাওয়ার পরও আমরা কোনও সরকারি সাহায্য পাই না। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে ভাল রোজগার হয় না। মাসে একজন তাঁতি বড়জোর ১০ হাজার টাকা আয় করেন। এই টাকায় এখন সংসার চলে না। ফলে নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চাইছে না। তারা অন্য কাজে চলে যাচ্ছে।” গ্রামে প্রায় হাজার ঘর তাঁতির বাস। অথচ সচল তাঁতের সংখ্যা নেমেছে ৩২০তে। কয়েক বছর আগেও যা সাতশোর বেশি ছিল। পলাশবাবুর কথায়, “বিগত সরকার আমাদের তাঁত শিল্পীদের ওপর নজরই দেয়নি।
বিশেষ করে গরদ শাড়ির কোনও মার্কেটিং হয় না। প্রচারের অভাবে আমরা বাজার পাচ্ছি না। শিল্পীদের দাবি, নতুন সরকার যদি মার্কেটিং, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেয়, তাহলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াবে। পলাশবাবু বলেন, “নতুন সরকার এসেছে। আমরা আশা করছি ওঁরা তাঁত শিল্পীদের দিকে তাকাবেন। সাহায্য পেলে আমরা গরদকে আরও উন্নত শিল্পে পরিণত করতে পারব। তাতে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ব্যবসায়িক লাভ হলে নতুন ছেলেমেয়েরাও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী হবে।” বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সরকারি উদাসীনতায় ধ্বংসের মুখে মির্জাপুরের গরদ শিল্প। শিল্পীদের একটাই আর্জি, জিআই ট্যাগকে সম্বল করে যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মেলে, তাহলে বাংলার এই গর্বের শিল্প আবার সোনালি দিন ফিরে পাবে। না হলে অচিরেই বিলীন হবে কয়েকশো বছরের এই ঐতিহ্য।