এক দেশ, এক নিয়ম। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর পথে হাঁটছে আরও এক রাজ্য। সোমবার অসম সরকার (Assam Government) রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করতে বিধানসভায় অধ্যাদেশ আনল। বিয়ে থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার–সমস্ত ক্ষেত্রেই সকলের জন্য একই নিয়ম চালু করা হবে। লিভ ইন বা একত্রবাসের রেজিস্ট্রেশন এবার বাধ্যতামূলক করার পথে এগোচ্ছে অসমের বিজেপি সরকার।
বিলে যে নিয়মগুলির কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে একত্রবাস সংক্রান্ত বিধিও। এর আওতায় একত্রবাসে থাকা যুগলকে রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। পাশাপাশি বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েরও উল্লেখ রয়েছে অসমের অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাইজোর দল-সহ বিরোধী দলগুলি এই বিল পেশের বিরোধিতা করেছে। বিল পেশের আগে সব পক্ষকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি তুলেছে তারা।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরাখণ্ডে প্রথম অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা হয়। এরপরে মার্চ মাসে গুজরাতেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হয়। মধ্যপ্রদেশেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির খসড়া তৈরির জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। গোয়াতে আলাদাভাবে গোয়া সিভিল কোড রয়েছে। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে যে প্রতিশ্রুতিগুলি দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল রামমন্দির প্রতিষ্ঠা, ৩৭০ অনুচ্ছেদ অবলুপ্ত করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা। প্রথম দুটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হলেও দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা যায়নি এখনও। তার মধ্যেই বিজেপি শাসিত একের পর এর রাজ্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করছে।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার হয়ে বিলটি অসম বিধানসভায় পেশ করেন রাজ্যের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী অতুল বোরা। এই বিলের মাধ্যমে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি লিভ-ইন সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে নথিভুক্ত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। সরকারের দাবি, সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতেই এই আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, বহুবিবাহের মতো প্রথা নারীদের অধিকার খর্ব করে এবং পারিবারিক সমস্যার জন্ম দেয়। সেই কারণেই একাধিক বিয়েকে বেআইনি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে সমাজে লিভ-ইন সম্পর্কের সংখ্যা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে এবং নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এমন সম্পর্কও সরকারি ভাবে নথিভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিয়ের জন্য পুরুষদের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং মহিলাদের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তের কথায়, “এই বিলটি অসমে একত্রবাসের সম্পর্ককে প্রথম বারের জন্য আইনি কাঠামোর আওতায় আনছে। সম্পর্কের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তিকরণের মাধ্যমে এই আইনটি একত্রবাসের সঙ্গীর অধিকার রক্ষা করবে। একই সঙ্গে এই ধরনের সম্পর্ক থেকে জন্ম হওয়া কোনও সন্তানের অধিকারকেও স্বীকৃতি দেবে এবং সুরক্ষিত করবে।” তবে এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি অসমে বসবাসকারী তফসিলি জনজাতির ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না বলেও জানিয়েছেন হিমন্ত। তবে বিলটি পেশ হতেই বিধানসভায় তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে সরকার। কংগ্রেস, রাইজোর দল এবং তৃণমূল কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি অভিযোগ তোলে যে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন আনার আগে সাধারণ মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, সামাজিক সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি।
বিরোধীদের বক্তব্য, এই বিল মানুষের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় অধিকারের সঙ্গে জড়িত। তাই তাড়াহুড়ো করে আইন পাস না করিয়ে আগে সর্বস্তরের মতামত নেওয়া উচিত। বিরোধী শিবিরের দাবি, এই বিলের ফলে রাজ্যের সামাজিক ও ধর্মীয় ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মুসলিম সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই আইন ব্যক্তিগত ধর্মীয় রীতিনীতির উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে। মঙ্গলবার, বিধানসভায় এই বিলটি নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।