সরকারি বৈঠকে হাজির বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিরাও! মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে যে দৃশ্য দেখা গেল, রাজ্য-রাজনীতিতে শেষ কবে তা দেখা গিয়েছে, অনেকেই মনে করতে পারছেন না। রাজ্যের নতুন সরকারের বৈঠকে বিরোধী দল তৃণমূলের সাত জন সাংসদ-বিধায়কের উপস্থিতি নানা জল্পনাও উস্কে দিয়েছে। তবে সে সবের ঊর্ধ্বে উঠে কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিনের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র বদল ঘটবে।
যদিও তৃণমূলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বছর চারেক আগে শিলিগুড়িতে আদিবাসী পরিষদের বৈঠকে ডাক পেয়েছিলেন মালদা উত্তরের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু এবং আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন বিধায়ক দশরথ তিরকে। ওই বৈঠকে খগেন উপস্থিতও ছিলেন। তবে এমন উদাহরণ যে সংখ্যায় কম, তা-ও মেনে নিচ্ছেন পূর্বতন শাসকদলের অনেকে।
মঙ্গলবার নদিয়ার কল্যাণীর এপিজে আব্দুল কালাম প্রেক্ষাগৃহে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও হুগলি জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। সরকারি সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই বৈঠকে ডাকা হয়েছিল বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদের। সেই মতো বৈঠকে যোগও দেন বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। এ ছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনায় তৃণমূলের মোট ৯ জন বিধায়কের মধ্যে ৬ জন উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্বরূপনগরের বীণা মণ্ডল, দেগঙ্গার আনিসুর রহমান ও হাড়োয়ার আবদুল মতিন, বাদুড়িয়ার বুরহানুল মুকাদ্দিম, বসিরহাট দক্ষিণের সুরজিৎ মিত্র এবং মিনাখাঁর উষারানি মণ্ডল।
বঙ্গ রাজনীতির বৃত্তে যাঁরা ঘোরাফেরা করেন, তাঁদের একাংশের মত, গত ১৫ বছরে এই দৃশ্য রাজ্যে দেখা যায়নি। অভিযোগ, কোনও প্রশাসনিক বৈঠকেই বিরোধীদলের সাংসদ, বিধায়ক বা কোনও জনপ্রতিনিধিকেই ডাকা হতো না। বিভিন্ন কমিটির মাথায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদেরও নানা প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু আমন্ত্রণ পাননি বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিরা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে বিরোধী দলনেতার পদে বসা শুভেন্দু সেই সময়ে একাধিক বার বিধানসভায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অবশেষে পালাবদলের পরে সেই ছবি বদলাল।
প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা তো গত পাঁচ বছর ডাক পাইনি। কিন্তু আমাদের সাংসদদের ফোনও ধরতেন না বিডিও, ওসি-রা। আজ এখানে বসিরহাটের বিধায়করা ছিলেন। তাঁদেরকে বলার সুযোগ দিয়েছি। আমরা চাই, কেন্দ্র-রাজ্য ডাবল ইঞ্জিনের সুযোগ পাক। সারা বছর কনস্ট্রাকটিভ আইডিয়া নিয়ে কাজ করি।’
শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে কাকলির হাজির থাকা নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়। তার কারণও রয়েছে। সমাজমাধ্যমের পোস্টে কাকলির ‘আনুগত্যের পুরস্কার’ মন্তব্য নিয়ে কয়েক দিন ধরে জোর চর্চা চলেছিল। তার মধ্যেই বারাসত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন প্রবীণ সাংসদ। সেই আবহে শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে কাকলির পৌঁছে যাওয়া নিয়ে কৌতূহল বেড়েছিল মঙ্গলবার সকালে। বৈঠকে যোগ দেওয়ার সময়ে কাকলি সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘প্রশাসন সকলের। এটা কোনও দলীয় বৈঠক নয়। প্রশাসনিক বৈঠকে তো আমি আসিই।’
পরে দেখা যায়, শুধু কাকলিই নয়, তৃণমূলের ৬ জন বিধায়কও শুভেন্দুর বৈঠকে গিয়েছেন। স্বরূপনগরের বীণা বলেন, ‘আমি আমার বিধানসভা এলারকার উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক বৈঠকে এসেছি। প্রশাসনিক মিটিং মানেই তো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা।’ বীণার মতো বাকিরাও জানান, নিজের এলাকায় উন্নয়নের স্বার্থেই তাঁরা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে আদৌ উন্নয়ন সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।
কিন্তু দল কি তাঁদের অনুমতি দিয়েছিল? আনিসুর বলেন, ‘আমি প্রথমবারের বিধায়ক। প্রথম বার ডাক পেলাম। দল তো এ ব্যাপারে কোনও ইনস্ট্রাকশন দেয়নি। আমি আমার এলাকার মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ। উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতেই হবে।’ হাড়োয়ার বিধায়ক বলেন, ‘এখানে দলের অনুমতির কী প্রয়োজন। উন্নয়নের স্বার্থেই তো এই মিটিং।’
দলের অনুমতি প্রসঙ্গে তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘এ বিষয়ে দলগত অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটা মনে করা যেতেই পারে যে, উন্নয়নের স্বার্থেই দলীয় বিধায়কেরা প্রশাসনিক বৈঠকে গিয়েছেন। গণতন্ত্রে বিরোধীদের ভূমিকা অত্যন্তই গুরুত্বপূর্ণ। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না। দলীয় নেতৃত্ব এ বিষয়ে পর্যালোচনা করবেন।’ উলুবেড়িয়া পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়েরও মত, ‘গণতন্ত্রে বিরোধীদের কথা বলতে পারা জরুরি। কবীর সুমন তো লিখেই গিয়েছেন— বিরোধীদের বলতে দাও, তোমার ভুলের ফর্দ দিক।’ প্রসঙ্গত, কয়েক দিন আগেই দিল্লিতে শুভেন্দু-ঋতব্রতের আচমকা সাক্ষাৎ হয়েছিল দিল্লিতে। সেখানে দু’জনের মধ্যে কিছু ক্ষণ কথাও হয়।
বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, বিরোধী জনপ্রতিনিধি সহযোগিতাও করেছেন বৈঠকে। তাঁদের কেউ কেউ বক্তৃতাও করেছেন। কাকলি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওঁকে ডাকতে বললাম। মঞ্চেও ছিলেন। যাওয়ার সময় হাত মেলালেন, বললেন, এরকম মিটিং আগে দেখিনি। কথাই বলতে দিত না।’ বরাহনগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ বলেন, ‘সরকার সকলের। গণতন্ত্রে এই জায়গা থাকা উচিত।’
নতুন সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়াল। তিনি বলেছেন, ‘প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধীরা থাকবেন, এটা ভালো। এটা মুখ্যমন্ত্রীর নীতিগত সিদ্ধান্ত।’