তিনি খুশি। আবার কিছুটা আশঙ্কিতও। তবে হাল ছাড়ছেন না স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার স্ত্রী মমতা কামিল্যা। নতুন রাজ্য সরকারের উপরে অগাধ আস্থা রয়েছে তাঁর। স্বপন খুনে মূল অভিযুক্ত রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের গ্রেপ্তারির খবর শুনে তাঁর চোখে জল চলে এল। সোমবার বিকেলে ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে কান্না ভেজা গলায় বললেন, ‘আমি খুশি, খুব খুশি। আশা করছি এ বার ন্যায় বিচার পাব।’
মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে পথচারীকে ধাক্কা মারার অভিযোগে প্রশান্ত বর্মনকে গ্রেপ্তার করেছে ইকো পার্ক থানার পুলিশ। সূত্রের খবর, নিউ টাউনের একটি বারে দেদার মদ্যপান করে গাড়ি হাঁকিয়ে সিটি সেন্টার ২-এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। অভিযোগ, তখনই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক পথচারীকে ধাক্কা মারেন। তার পরে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। পথচারীরাই তাঁকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। রাতভর থানায় আটক করে রাখার পরে এ দিন সকালে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে স্বপন কামিল্যা খুনের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।
এই খবরে একটু চিন্তায় পড়লেন মমতা। যেন কিছু হতাশ। একবার বলেও ফেললেন, ‘তাই? তা হলে কী হবে?’ তবে আশায় বুক বাঁধলেন নিজেই। সরাসরি বলে দিলেন, ‘তবে আমার আশা, নতুন রাজ্য সরকার ঠিক শাস্তি দেবে। তাঁকে ছাড়বে না।’ এখন শুধু প্রশান্তর শাস্তি চান মমতা। এটাই তার পাখির চোখ। মমতার কথায়, ‘রাজ্য সরকারকে বলব, ওকে (প্রশান্ত বর্মন) কোনও ভাবেই ছাড়বেন না। ফাঁসি দিন।’
পশ্চিম মেদিনীপুরের মোহনপুর থানার দিলমাটিয়া গ্রামে বাড়ি ছিল স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার। তবে ব্যবসার সূত্রে সল্টলেকের দত্তাবাদে থাকতেন। গত বছরের ২৮ অক্টোবর তাঁকে অপহরণ করে খুনের অভিযোগ ওঠে রাজগঞ্জের তৎকালীন বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে। উত্তরবঙ্গে প্রশান্তর বাড়ি থেকে নগদ টাকা এবং সোনার গয়না চুরি গিয়েছিল। প্রশান্তর দাবি, স্বপন সেই সব চুরির জিনিস কিনেছিলেন। তার পরেই তাঁকে অপহরণ করে নিউ টাউনের এবি ব্লকের ৬৭ নম্বর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ব্যাপক মারধর করার অভিযোগ উঠেছিল প্রশান্ত ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে। ২৯ অক্টোবর বাগজোলা খালপাড়ের যাত্রাগাছি থেকে স্বপনের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। নিহতের পরিবার বিডিও ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় অপহরণ ও খুনের অভিযোগ দায়ের করেন।
এখনও দৃঢ় গলায় প্রশান্তর বিরুদ্ধেই খুনের অভিযোগ করছেন মমতা। স্পষ্ট বললেন, ‘প্রশান্তই খুন করেছেন। এতে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই।’ শ্বশুর-শাশুড়ি আর দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সংসার মমতার। স্বপনই বাড়ির একমাত্র রোজগেরে ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পরে অথৈ জলে পড়েছেন তিনি। কী ভাবে পেটের ভাত জোগাড় হবে, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবেন, ভাবতে ভাবতে ঘুম উড়ে যাওয়ার জোগাড়। মমতা বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কী ভাবে সংসার চলছে একমাত্র আমি আর ভগবানই জানে।’ তাঁর মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর ছেলে এ বারে মাধ্যমিক দেবে। কান্না চাপতে চাপতে মমতা কোনও রকমে বললেন, ‘দুটো পয়সার জন্য আমি এখন লোকের বাড়িতে কাজ করি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে, আমার একটাই আর্জি, ওই লোকটাকে (ধৃত প্রশান্ত বর্মন) ছাড়বেন না। যত কঠিন শাস্তি হয় দিন।’
প্রশান্ত তৃণমূল সরকারের শীর্ষস্থানীয়দের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ। সেই জন্যই নাকি খুনের অভিযোগ উঠলেও যথাযথ পদক্ষেপ করতে টালবাহানা করেছে পুলিশ। অন্তত অভিযোগ এমনই। পরে আদালতের চাপে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। সেই মামলা কলকাতা হাইকোর্ট ছাড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিল। গত জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশান্তকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু প্রশান্ত সেই নির্দেশও মানেননি। তিনি ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান। অবশেষে পাঁচ মাস পর তাঁর খোজ মিলেছে। মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। এ দিন বারাসত আদালতে তাঁকে ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গ করার জন্য তোলা হয়েছিল।সব জেনে দাঁতে দাঁত চেপে মমতা বললেন, ‘আমি জানি, ন্যায় বিচার পাবই।’