পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। বিপুল জনমত নিয়ে মসনদ দখল করেছে বিজেপি। আর রাজ্যে পালা বদলের পরই একাধিক 'ইঙ্গিতবাহী' পোস্ট করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের চিকিৎসক নেতা ডা: শান্তনু সেন। ২৩ মে তিনি শুভেন্দু অধিকারী সরকারের প্রশংসা করে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন। আর সেই ট্রেন্ড বজায় রেখেই তিনি ২৫ মে একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্টে আরজি কর কাণ্ডের অভীক দে থেকে শুরু করে তৎকালীন ডিরেক্টর অব মেডিক্যাল এডুকেশন ডা: কৌস্তভ নায়েক, তৎকালীন ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের এক চিকিৎসক নেতা ডা: সুদীপ্ত রায় এবং গোটা 'উত্তরবঙ্গ লবির' কঠোর সমালোচনা করেন শান্তনু। সেই সঙ্গে আবারও তাঁর লেখায় উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা।
আর তাঁর এই পোস্টের পরই রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, হঠাৎ কেন বেসুরো শান্তনু? এর পিছনে ঠিক কী ইঙ্গিত রয়েছে? এই বিষয়টা নিয়েই bangla.aajtak.in-এ মুখ খুললেন শান্তনু। তিনি স্পষ্ট বলেন, 'তৎকালীন রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত হওয়ার পর, সন্দীপ ঘোষের (আর জি করের তৎকালীন প্রিন্সিপাল) নেতৃত্বাধীন এবং সুদীপ্ত রায়ের করে যাওয়া ভূরি ভূরি দুর্নীতির কথা প্রথম আমি নজরে আনার চেষ্টা করেছিলাম।' আর সেই কারণেই তাঁকে অপরিসীম অন্যায়-অপমান সহ্য করতে হয় বলে দাবি করেন শান্তনু।
তাঁর অভিযোগ, 'পরবর্তী ক্ষেত্রে আমাকে রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আমি তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছিলাম যে প্রাক্তন রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান ডা: সুদীপ্ত রায়, সেই সময়ে যিনি বিধায়ক ছিলেন এই অঞ্চলের এবং মহামহিম মহমান্য ডাক্তার সন্দীপ ঘোষ, তাদের যৌথ নেতৃত্বে এবং কর্তৃত্বে কীভাবে আরজি করে ভূরি ভূরি দুর্নীতি হয়েছিল। আমি কোনও সংবাদ মাধ্যমকে না জানিয়েও কর্তৃপক্ষের নজরে সেগুলো আনার চেষ্টা করেছিলাম। পরবর্তী ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে উল্টে আমাকেই সরে যেতে হয়।'
তিনি দাবি করেন, আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদ করার জন্য মানসিকভাবে নির্যাতিত হতে হয়েছে। এমনকী তাঁর মেয়ে, যে কি না সেই হাসপাতালে পাঠরতা ছিলেন, তাঁর ওপরও মর্মান্তিক মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে দিনের পর দিন।
শান্তনুর কথায়, 'তথাকথিত উত্তরবঙ্গ লবির নেতৃত্বে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, সেটা ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল হোক, সেটা রাজ্য স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা সেটা হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড হোক, কীভাবে দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তখনও ছিল, এখনও থাকবে। সেই লবির কাছে কোনও আপোস করিনি বলে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে কী কী অত্যাচার, অবিচার, অনাচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটা নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।'
আর ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি এবং বর্তমান রাজ্য সম্পাদক হিসেবে এখনও তাঁর আরজি করের ঘটনায় প্রতিবাদ রয়েছে বলে জানালেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে দরাজ সার্টিফিকেট
হঠাৎ কেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকাররী প্রশংসা করছেন শান্তনু? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'একটা নতুন সরকার বাংলার রায়ে নির্বাচিত হয়েছে। তারা যদি তাদের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে যদি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আরও সদর্থক ভূমিকা নেয়, তারা মানুষকে আরও বেশি করে স্বাস্থ্য পরিষেবা বিনামূল্যের দেওয়ার জন্যে যদি আয়ুষ্মান ভারত চালুর কথা বলে, বাংলায় যে চারটে জেলায় এখনও মেডিক্যাল কলেজ নেই, সেখানে যদি নতুন মেডিক্যাল কলেজ করার কথা বলে, আরও নতুন করে ৪৬৯টি প্রধানমন্ত্রী জনঔষধি কেন্দ্র তৈরি করার কথা বলে, অসংখ্য যে খালি পদগুলো আছে, সেখানে নিয়োগের কথা বলে—সেগুলো হলে তো সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের পরিকাঠামোর আরও উন্নয়ন হবে। একজন চিকিৎসক আন্দোলনের একজন যোদ্ধা হিসেবে যদি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর আরও উন্নয়নের কথা বলে, তো তাকে সাধুবাদ জানানোটা তো স্বাভাবিক।'
পাশাপাশি তিনি জানান, আরজি কর কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত উত্তরবঙ্গ লবির সকলের বিরুদ্ধে যদি সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে, তাহলে সেই পদক্ষেপকেও যে কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ সাধুবাদ জানাবে।
কিন্তু এই ধরনের পোস্টের জন্য তৃণমূল কি কিছুই বলছে না তাঁকে? শান্তনু বলেন, 'আমি তো অন্যায় কিছু বলেছি বলে মনে হয় না। আমি আরজি করের বিচার সে দিনও চেয়েছিলাম, আজকেও চাইছি। সেটা আমি কেন সারা পৃথিবীর মানুষ অভয়ার বিচার চায়। সারা পৃথিবীর মানুষ মনে করে যে এটা কোনও একজনের কাণ্ড নয়। এর পেছনে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আরও অনেকে জড়িয়ে আছে।'
যদিও এখনও তিনি তৃণমূলে রয়েছেন কি না, তা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন শান্তনু। তিনি বলেন, 'আমি একজন চিকিৎসক।চিকিৎসা আমার পেশা এবং অবশ্যই আমি একজন রাজনৈতিক মানুষ, রাজনীতি আমার নেশা। আমি জীবনে যতদিন সুস্থ-সবল থাকব, আমি আমার পেশাও ছাড়বো না আমি আমার নেশাও ছাড়বো না।'