• ভাঙা মাটির চালা, পাটের বস্তায় বসে পড়াশোনা, দেশে নিউরোলজিতে শীর্ষে জঙ্গলমহলের অনুশ্রী
    প্রতিদিন | ২৭ মে ২০২৬
  • লাক্ষা গোডাউনের পাশে ছোট্ট একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। অর্ধেক ভাঙা খাপরার চালা। নেই বিদ্যুৎ, নেই শৌচাগার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাটের বস্তা টেনে সেখানে বসে লেখাপড়া চলতো তাঁদের। বৃষ্টি ভেজা দিনে টালি বেয়ে জল পড়লে ওই বস্তা গুলো টেনে সরাতে হত। সেই স্কুলে পড়েই পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল বলরামপুরের মেয়ে চিকিৎসক অনুশ্রী পাল নিউরোলজিতে প্রেসিডেন্টস গোল্ড মেডেল পেলেন।

    এই বিভাগে সমগ্র দেশের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছেন। ন্যাশনাল বোর্ড অফ এক্সামিনেশনস ইন মেডিক্যাল সায়েন্স পরিচালিত স্নাতকোত্তর চিকিৎসা পরীক্ষা ডিআরএনবিতে প্রথম হওয়ায় শনিবার দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ২৩তম সমাবর্তনে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নাড্ডা এই সম্মান প্রদান করেন। বাংলা থেকে বিভিন্ন বিভাগে তিনজন ডিআরএনবি। সমগ্র দেশ মিলিয়ে ডিপ্লোমা, ডিপ্লোমাট, ডক্টরেট, বিশিষ্ট মিলে ১৩৭ জন এই সম্মান পেয়েছেন। পুরুলিয়ার তরুণী চিকিৎসকের এই সম্মানে গর্বিত জঙ্গলমহল। পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো এবং বলরামপুরের বিধায়ক জলধর মাহাতো ওই চিকিৎসককে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

    তবে বনমহলের ৩৫ বছরের অনুশ্রীর এই সাফল্য সহজ ছিল না। বাড়ির পাশে বিবেকানন্দ শিশু নিকেতন নামে ওই প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ওই রকম পরিবেশে প্রাথমিক পাঠ।
    তাছাড়া তখন জঙ্গলমহল ছিল অশান্ত। মাওবাদী কার্যকলাপে বলরামপুরে খুন, নাশকতা, গুলির লড়াই যেন নিত্যদিনের ঘটনা ছিলো। বাবা অমৃতকুমার পাল ঝাড়খণ্ডের কোলহান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মা নিভা পাল উচ্চশিক্ষিতা হওয়ায় মাধ্যমিক পর্যন্ত তাঁর কোনও প্রাইভেট টিউটর ছিল না। স্কুল ছাড়া লেখাপড়ার সবই তার মা-বাবার কাছে। বিশেষত তাঁর মায়ের কাছে। প্রাথমিক পাঠ শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সে বলরামপুরে লালিমতি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ত। তারপর পুরুলিয়া শহরের শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক। জয়েন্টের পর আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে জেনারেল মেডিসিনে এমডি। এরপর ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্স কলকাতা থেকে নিউরোলজিতে ডিআরএন বি ( ডক্টরেট অফ ন্যাশনাল বোর্ড)। আর তারপর প্রেসিডেন্টস গোল্ড মেডেল প্রাপ্তি। একেবারে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্স অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট হিসাবে এখন কর্মরত।

    অনুশ্রী আজ বহু ছাত্র-ছাত্রীর কাছে প্রেরণা। দাদা ও স্বামী দু’জনই চিকিৎসক। অনুশ্রীর কথায়, “আজ বলরামপুর যা, তিন দশক আগে তা ছিল না। আধা শহর বললেও বাড়িয়ে বলা হয়। এখন মনে হয় আমি যেন একটা অন্য জগতে বাস করতাম। আজ এই খানে পৌঁছতে সত্যিই রক্ত, ঘাম আর চোখের জল ঝরেছে। কত রাত যে না ঘুমিয়ে কেটেছে। খালি পেটে ঘণ্টার পর ঘন্টা ডিউটি। কী ত্যাগ করেছি সে শুধু আমি জানি। তবে আমি আজ খুশি।” এই সাফল্যের সমস্ত কৃতিত্ব অনুশ্রী তাঁর বাবা-মার উপর দিতে চান। তাঁর কথায়, “এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে বাবা প্রচণ্ড দাবদাহে ২০ মিনিট সাইকেল চালিয়ে স্টেশনে যেতেন। দু’ঘণ্টা যাত্রা করে কর্মস্থলে পৌঁছতেন। শুধু যাতে আমরা ভালো থেকে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি। মা সারাদিন সংসারের কাজ করার পর রাতে ঘণ্টারর পর ঘণ্টা জেগে আমাকে অঙ্ক করাতেন।” এই সম্মান পেয়ে দিল্লি বিজ্ঞান ভবনে বাবাকে মেডেলটি পড়িয়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসক মেয়ে। তাঁর কথায়, “এখন সেই পিছন ফিরে জার্নিটার দিকে তাকালে অবিশ্বাস্য মনে হয়। মনে হয়, কোনও গল্প। এটা ভেবে ভালো লাগে, বাবা-মাকে গর্ব করার মতো কিছু আমি ফিরিয়ে দিতে পেরেছি।”
  • Link to this news (প্রতিদিন)