রবীন্দ্রনাথের অনুমতিতেই কেনা হয়েছিল গোটা পাঁচেক গোরু
এই সময় | ২৬ মে ২০২৬
এমন একটা সময় ছিল যখন শান্তিনিকেতন জুড়ে ভয়ানক দুধের আকাল চলছে। মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত বহু শিশুর জন্য এক বাটি গোরুর দুধও জোগাড় করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। অজানা জ্বরে আক্রান্ত দুর্বল রোগীদের একগ্লাস দুধের পরিবর্তে সাবু বা বার্লি খেতে হচ্ছিল। এমন সমস্যা মিটবে কী ভাবে, তার কোনও হদিশ কারও কাছেই ছিল না। শান্তিনিকেতনে তখন সবুজেরও বড় অভাব ছিল। এমন পরিবেশে গোরু পালনও ছিল যথেষ্ট দুঃসাধ্য।
নগেন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘বোলপুরে গোরু রাখার বিস্তর অসুবিধা। ঘাস নেই, গোরুর অন্য খাবারও বহুদূর থেকে বেশি দাম দিয়ে আনিয়ে নিতে হয়। তবু দেখা যাচ্ছে লোকসান হওয়ার আশঙ্কা নেই। আর যদি গোটা দশেক গোরু আনা যায়, তা হলে ওই জায়গাতেই ১৫০ থেকে ২০০টাকা মাসে খরচ বাদে পাওয়া যেতে পারে। এটা বেশ দেখা যাচ্ছে, চাষের চেয়ে আমাদের দেশে গোরুর ব্যবসা অনেক বেশি লাভজনক।’
গো-ব্যবসার নেপথ্যে অবশ্য অন্য ইতিহাস রয়েছে। সন্তোষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সহপাঠী। বিদেশে উচ্চশিক্ষার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ১৯০৮ সালের নভেম্বর মাসে মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর পিতা শ্রীশচন্দ্র মারা গেলেন। নিরুপায় হয়ে বিদেশ থেকে ফিরে এলেন তিনি। সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর উপরে। দেশে ফিরে মনস্থির করলেন চাকরি নয়, নিজে স্বাধীন ব্যবসা করবেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে পরামর্শ চাইতে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ আগে-ভাগে তা ভেবে রেখেছিলেন। কারণ, সেই সময়ে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে ছাত্র সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০ জন। সেই সব শিশু ও বালকদের জন্য পর্যাপ্ত দুধ জোগাড় করাও ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার।
রবীন্দ্রনাথের অনুমতি পেতেই শুরু হয়ে গেল গো-ব্যবসা। শুধু পাশে থাকার বার্তা পেতেই বোলপুর স্কুলের পাশেই গড়ে উঠল নতুন গোয়ালঘর। হাজার টাকায় কেনা হয়ে গেল গোটা পাঁচেক গোরু। জমে উঠল গোশালার ব্যবসা। লাভের অঙ্ক বাড়তে থাকে। অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘যে রকম হিসাব করা যাচ্ছে এখনও অবধি, তাতে দেখছি, বোলপুরেই অতি সহজে মাসিক দুশো টাকা লাভের কাজ করতে পারবে। এমন স্থানে কোনও কোম্পানির অধীনে চাকরিতে প্রবৃত্ত হওয়ায় কি সুবিধা হবে?’ উল্লেখ্য, লক্ষ্মীর আশীর্বাদে সন্তোষের সংসারের অভাব, অনটনও সাময়িক ইতি ঘটল।
শুধু গোরু নয়, আশ্রমের ছেলেদের পুষ্টির কথা ভেবে রবীন্দ্রনাথ ছাগলও কিনতে চেয়েছিলেন। সে জন্য চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে চিন্তামণি ঘোষকে কিছু ছাগল পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন। মজা করে বলেছিলেন, এক ট্রাক ছাগল পাঠালেও আমাদের অসুবিধা নেই। তবুও কিছু না কিছু সমস্যা লেগেই থাকতো। বড় দুশ্চিন্তাও করতেন রবীন্দ্রনাথ। গোরুর খাবার আর দুধ দোয়ানোর গোয়ালার জন্য আবারও আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালের কাছে। ‘ভূষি এখানে পাওয়া যায় না। গোয়ালাও নাই। বড় মুশকিলে পরা গিয়েছে। ভূষি আপনাদের অঞ্চলে যদি সস্তায় পাওয়া যায়, তবে আপনার সাহায্যে আনাইবো। দর কত? গোয়ালা ওখান হইতে দু’একজনকে কি পাওয়া যায় না?’ অর্থাৎ, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে রবীন্দ্রনাথের প্রচেষ্টা ও ভাবনার অন্ত ছিল না।
ইতিমধ্যে গোশালাকে আরও বড় করার জন্য সুপুরের জমিদারের থেকে আরও একশো বিঘা জমি কম দামে কিনিয়ে দিয়েছিলেন ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক রবীন্দ্রনাথ। এই বিশাল জমিতে গোরুর খাবার উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিছুদিন পরে এই গোশালা অবশ্য স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল সুরুলে। কারণ সময়ের পরিবর্তন, সঙ্গে অর্থসঙ্কট ও যোগ্য কর্মীর অভাব। সবচেয়ে বড় কথা, রবীন্দ্রনাথ ‘সময়’ ও ‘নজরদারি’ দুটোই আর পারছিলেন না সাহিত্য-সৃষ্টির নানা কাজের চাপে।
(ঋণ স্বীকার: পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকারের ‘দিনগুলি তাঁর’ বইটি থেকে)