গত ১৫ বছর উদ্ভট সময় পার করেছি, আমরা চাই না ইন্ডাস্ট্রি কোনও রাজনীতিক চালাক: ঋত্বিক চক্রবর্তী
প্রতিদিন | ২৬ মে ২০২৬
প্রশ্ন : আপনার নতুন ছবি ‘ফেরা’র মুক্তি শুক্রবার। বাবা-ছেলের সম্পর্ক ছবির মেরুদণ্ড। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে সাহায্য করেছে?
ঋত্বিক : হ্যাঁ, সাহায্য করেছে। ছবিটার মূল জায়গা– বাড়ি ছেড়ে কাজের প্রয়োজনে একটা অন্য শহরে এসে থাকা এবং ক্রমশ বাড়ি ফেরা কমে যাওয়া। এগুলো হয়তো প্রত্যেকের জীবনেই অল্পবিস্তর ঘটে। বাড়ি ছেড়ে যখন আসি, শুধু বাড়ি তো নয়, বাবা-মাকেও ছেড়ে আসি। এবং দিন যায়, তাদের বয়স বাড়তে থাকে, দুশ্চিন্তা হয় যে, একা একা বাড়িতে কী করছে। আবার তারাও শহরে আমাদের যে থাকার জায়গা, সেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কারণ, তাদেরও জীবন আছে। বাড়ি ছেড়ে মা আমার ফ্ল্যাটে এলে মেরেকেটে কুড়িদিন। তার পরে আর থাকতে পারে না। কারণ, সকাল থেকে সন্ধে অবধি তার জীবন এখানকার দিনগুলো থেকে আলাদা। আমি বাড়ি ছেড়ে এসে মানিয়ে নিয়েছি, তার তো মানানোর কোনও প্রয়োজন নেই। ফলে তার বারাকপুরের বাড়িতে থাকাই বেশি পছন্দ। এগুলো আমরা সকলেই ফিল করি। এই ছবিতে পুরোমাত্রায় এইগুলো আছে। আমাদের বাড়িতে ৬টা নারকেল গাছ, ১২টা সুপুরি গাছ, প্রকৃতি অন্য ধরনের। তা ছাড়া ওখানে ফেরিওয়ালারাও বন্ধু, বাড়ির পাশের পুকুরে যারা চান করতে আসে, তাদেরও মা চেনে, কথা বলে। এই সব তো শহরে এসে বাদ পড়ে যায়। তবে এই ছবিতে আমার চরিত্রের সঙ্গে তার বাবার দূরত্ব আছে। বাস্তবে আমার সঙ্গে বাবার দূরত্ব ছিল না। বরং আমি আজকে যা, তার পিছনে বাবার ভূমিকা রয়েছে। ছবিতে মিল-অমিল দুটোই আছে।
প্রশ্ন : আমরা চাইলেই কি ফিরতে পারি, যেখানে ফিরতে চাই? এমন কোনও জায়গা আছে যেখানে ফিরতে চান?
ঋত্বিক : আমার নিজের যেখানে ফিরতে হত, সেগুলো অনেকদিন ধরেই ছুঁয়ে আছি আমি। আমি তাদের ছেড়ে চলে যাইনি, যে আমাকে ফিরতে হবে। অনেক আগে যখন আমি সদ্য বাড়ি ছেড়েছি, আমাদের বাড়ির ডায়নামিক্স তখন বদলাচ্ছে। আমার আগে আমার দুই দাদা চাকরি সূত্রে বেরিয়ে গেছে। আমি কলকাতায় ছিলাম। তারা আবার কলকাতায় ফিরেছে। আমি যখন প্রথম কলকাতায় এসেছি, সাংঘাতিক হোমসিক ছিলাম। হোমটা এক থাকে না, কিন্তু হোমসিকনেস থেকে যায়। পরিবর্তন যে কারণে ধ্রুব, বাড়িটাও বদলাতে থাকে।
প্রশ্ন : সঞ্জয় মিশ্রর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
ঋত্বিক : দারুণ। একটা অভিনয় দিয়ে ওঁকে বোঝা যাবে না। ঘটনাচক্রে এটা ওঁর প্রথম বাংলা ছবি কিন্তু হয়তো একলক্ষ-তম অভিনয়। ফলে প্রথম বাংলা ছবি হলেও অভিনেতা তো একই। যে ভাষায় অভিনয় করছেন তার প্রতি যদি একশো শতাংশ দখল না থাকে সেটা সাংঘাতিক বাধা, যা একজন অভিনেতাকে অতিক্রম করতে হয়। সেটা আমার মাথা ঘামানোর বিষয় ছিল না। কিন্তু আমি দেখছিলাম কীভাবে সেটা উনি অতিক্রম করছেন। তা নিয়ে আমাদের কথা হচ্ছিল। উনি বাঙালি কালচারের সঙ্গে অপরিচিত নন। কলকাতায় থেকেছেন। বিহারের মানুষ হওয়ার ফলে প্রচুর বাঙালি দেখেছেন। এখনও ওঁর ঘনিষ্ঠ বাঙালি বন্ধুবান্ধব আছেন। তা সত্ত্বেও অভিনেতাদের ক্ষেত্রে ভাষাটা গুরুত্বপূর্ণ। উনি যেভাবে চরিত্রটা ধরে ফেললেন তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ছবির বাইরে আমাদের একটা নিজস্ব সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শুটিংয়ের সময় দু’জনের ভিতরের এনার্জি প্রতিফলিত হয়েছে। সবটা তো আসলে স্ক্রিপ্ট ধরে হয় না। অনেক কিছুই আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে করেছি যা চিত্রনাট্যে ছিল না। এগুলো তখনই ঘটে যখন দু’জন অভিনেতার মধ্যে রসায়ন তৈরি হয়। আর উনি তো এমনি এমনি বিখ্যাত অভিনেতা নন। উনি জানেন কখন কীভাবে রিঅ্যাক্ট করতে হয়। অভিনেতার কাজ সহশিল্পীর সঙ্গে সেই রসায়ন তৈরি করা। দু’জনেই কনট্রিবিউট না করলে সিনটা ভালো হবে না আমরা জানি। দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা ওঁর সঙ্গে কাজ করা এবং ব্যক্তিগত স্তরে আলাপ হয়ে যাওয়া।
প্রশ্ন : আর পৃথা চক্রবর্তী খুব সংবেদনশীল পরিচালক।
ঋত্বিক : পৃথার সঙ্গে আগে কাজ করেছি অন্য একটি ছবিতে। সেটা এখনও মুক্তি পায়নি। ওর সংবেদনশীলতা, লেখার সঙ্গে আমি পরিচিত। জীবনকে ও যেভাবে দেখছে সেটা সিনেমায় ট্রান্সফর্ম করাটা অভিনেতা হিসাবে আমার খুব পছন্দ। ‘পাহাড়গঞ্জ হল্ট’ করতে করতেই মনে হয়েছিল পৃথার সঙ্গে আবার কাজ করতে পারলে ভালো লাগবে। এখন দুটো ছবি হয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে আমরা আবার কাজ করব।
প্রশ্ন : সিনেমার বাইরে যাই। সম্প্রতি আপনার একটি পোস্ট ঘিরে খুব চর্চা হয়েছে। যেখানে ট্রোলারদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন। এই বক্তব্যে অনেকে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। তার মধ্যে চাকরি প্রার্থীরাও আছেন। আপনি কী বলবেন?
ঋত্বিক : আমি বলব তাঁরা পুরোটা বোঝেননি। পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে কোনও লোক যদি শুধু গালাগাল দেওয়ার জন্য ট্রোল করে, তাতে কোনও লোক যদি আহত হন তা হলে বলব তাঁরা গালাগাল বাজদের পক্ষে আছেন। আমার বলাটা আমার পোস্টে আছে। তাঁদের বলাটা কমেন্টে। সেখানে আমি আজও মনে করি, যে মানুষগুলো শুধু ট্রোল করতে গালাগালি করেন, তাঁদের কোনও উপযুক্ত কাজ নেই। এটা চিন্তার। তাঁদের কাজ থাকলে হয়তো এটা করতে হত না।
প্রশ্ন : অনেক সময় দ্ব্যর্থবোধক-তির্যক পোস্ট করেন। রাজনৈতিক পোস্ট করা থেকে একটু বিরত থাকবেন বলে মনে হয়?
ঋত্বিক : জানি না। আমি আসলে রাজনৈতিক পোস্ট করি না। আমি সামাজিক পোস্ট করি বলে আমার মনে হয়। সমাজের সঙ্গে রাজনীতি জড়িয়ে আছে বলে ওগুলোকে রাজনৈতিক মনে হয়। যদি কেউ আমার ফেসবুক পুরোটা দেখেন, বুঝতে পারবেন আমি সামাজিক পোস্টই করি। তাদেরই গায়ে লাগছে যাদের রাজনৈতিক কোনও ইন্টারেস্ট আছে। পুরোটাই সামাজিক বার্তা। আমার ভাষায় না হোক অন্তত দু’কোটি লোক এমন কথাবার্তা বলছে।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক পালাবদল হল এরপর বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কিছু বদল আসবে বলে মনে হয়। কী প্রত্যাশা?
ঋত্বিক : আমার প্রত্যাশা কোনও কিছুর রাজনীতিকরণ হবে না। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষ করে রূপাদি এবং রুদ্রর কথা জানি। তাদের সঙ্গে কাজও করেছি, পরিচয় আছে। ওরাও জানে জনপ্রতিনিধি দিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রি চালানো যাবে না। এই ইন্ডাস্ট্রিকে তার নিজের মতো করেই চলতে হবে। সম্ভবত রূপাদি এমন বার্তাও দিয়েছেন। গত ১৫ বছরে আমরা উদ্ভট সময় পার করেছি। অনেক উদ্ভট কিছুকে নিউ নরম্যাল বলে মনে হয়েছে। আমাদের গুলিয়ে গেছে, এটা হওয়ার কথা ছিল না। সেই সময় এত শিল্পী-পরিচালক ‘ব্যান’ হয়েছেন অথচ প্রশাসনের তরফে কোনও প্রতিবাদ হয়নি। কোনও রাজনীতিকরণের প্রয়োজন ছিল না। অবশ্যই প্রয়োজনে একটা ইন্ডাস্ট্রিকে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে হয়। সাহায্য নিতে হয়। সেটা প্রয়োজনে নিতেও হবে। আমরা কেউই চাই না ইন্ডাস্ট্রি কোনও রাজনীতিক চালাক।