লক্ষ্য বিরোধী শূন্য দেশ, শুরু অপারেশন লোটাস, বঙ্গ জয়ের পরই বিজেপির নিশানায় আঞ্চলিক দল
বর্তমান | ২৭ মে ২০২৬
সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: আশঙ্কা রাজ্যে রাজ্যে। দেশজুড়ে বিজেপির জয়যাত্রায় বিরোধী দলগুলি শুধু যে ভোটে হেরে সংসদীয় রাজনীতিতে ব্যাকফুটে তাই নয়! দল ধরে রাখাটাই কমবেশি প্রতিটি দলের কাছে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভাঙনের মুখে একঝাঁক আঞ্চলিক পার্টি। বঙ্গ বিজয়ের পর বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের লক্ষ্য একটাই—সংঘ পরিবারকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলা। আর তাই অদৃশ্য এক অপারেশন লোটাসের পরিকল্পনা দানা বাঁধছে। সবার আগে বিরোধীশূন্য হয়ে যাচ্ছে ওড়িশা। অস্তিত্ব রক্ষায় ধুঁকছে বিজু জনতা দল। নবীন পট্টনায়েক শত প্রয়াসেও দল অটুট রাখতে পারছেন না। বিজেডির রাজ্যসভার এমপি পদ থেকে সোমবারই ইস্তফা দিয়েছিলেন দেবাশিস সামান্তারি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি বিজেপিতে। ফলে, রাজ্যসভায় বিজু জনতা দলের এমপির সংখ্যা কমে হল ৫।
আগামী বছর ওড়িশায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে বস্তুত বিজেপির সামনে কোনো শক্তিশালী চ্যালেঞ্জার থাকবে না বলেই রাজনৈতিক দলের অভিমত। কারণ, কংগ্রেস এবং বিজেডি—দুই দলই চরম নেতৃত্বহীনতায় দীর্ণ। আবার মঙ্গলবারই পাশের রাজ্য বিহারে জোরদার ধাক্কা খেয়েছে লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল। দলের মহিলা শাখার প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রিতু জয়সওয়াল তাঁর অনুগামী ও নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। অঙ্গ এবং কলিঙ্গের ধাঁচে বিজেপির টার্গেট অবশ্যই বঙ্গ। লক্ষ্য তৃণমূলে ভাঙন ধরানো। রাজধানী দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে জোরদার জল্পনা, লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের ৪২ জন এমপির সঙ্গে বিজেপি যোগাযোগ করেছে। সব মিলিয়ে ১৯ জনকে নাকি দলে টানার চেষ্টা হবে আগামী দিনে। যাতে দলত্যাগ বিরোধী আইন বাধা না হয়। কয়েকদিন ধরেই কাকলি ঘোষদস্তিদার গুঞ্জনের শিরোনামে। কিন্তু তিনি যদি সত্যিই দলবদল করেন, তাহলে কি একাই করবেন? নাকি তাঁর পিছনে আছে আরও এমপি, বিধায়কদের নাম? এ পর্যন্ত একদিনও ৮০ জন বিধায়ক এবং ২৯ জন এমপিকে একসঙ্গে কোনো বৈঠকে দেখা যায়নি। যদিও সবটাই এখনও পর্যন্ত জল্পনার ঘোলাজল বলেই তৃণমূল নেতৃত্ব উড়িয়ে দিয়েছে। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য নিজেই সম্প্রতি ভিডিওবার্তায় বলেছেন, ‘যাঁরা চলে যেতে চান, যেতে পারেন।’ এই পরিস্থিতিতে পূর্ব ভারতে বিজেপির কাছে অধরা থেকে যাচ্ছে একমাত্র ঝাড়খণ্ড। অতএব স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী নিশানায় এই রাজ্য। আর সেই পর্ব খুব শীঘ্রই শুরু হতে পারে। কারণ, ১৮ জুনের রাজ্যসভা নির্বাচনে ঝাড়খণ্ডের দুই আসনে হবে নির্বাচন। বিজেপি ঘোষণা করেছে, তারা প্রার্থী দেবে। এনডিএ’র কাছে এই রাজ্যে রয়েছে ২৪ জন বিধায়ক। একজন প্রার্থীকে রাজ্যসভায় পাঠাতে হলে ঝাড়খণ্ডে প্রয়োজন ২৮ জন বিধায়কের প্রথম প্রেফারেন্সের ভোট। ৮১ আসনের এই রাজ্যে মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’র শক্তি ৫৬। সুতরাং স্বাভাবিক সম্ভাবনা হল, ইন্ডিয়ার দুই প্রার্থীই রাজ্যসভায় জয়ী হবে। এটা জেনেও বিজেপি ঘোষণা করেছে যে, তারা প্রার্থী দেবে এবং দাবি করেছে, সেই প্রার্থী জয়ী হবেন। বিধায়ক কেনাবেচার আশঙ্কা করে সোমবারই ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লিখেছে। অভিযোগ করেছে, বিজেপি এখন থেকেই বিধায়কদের অনৈতিকভাবে দলে টানার চেষ্টা করছে। সুতরাং আপনারা ব্যবস্থা নিন। তেলেঙ্গানার ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির বিধায়কদের সঙ্গে বিজেপি যোগাযোগ করছে বলে অভিযোগ কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের দলের। এই রাজ্যে বিআরএসকে সরিয়ে বিজেপি চাইছে প্রধান বিরোধী দল হতে। রাজ্যে রাজ্যে অ-বিজেপি দলে ভাঙন ধরিয়ে সেই দলগুলিকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেওয়ার যে ব্লু-প্রিন্ট গেরুয়া শিবির নিয়েছে, তার সাম্প্রতিকতম জোরালো অভিযান দেখা যাচ্ছে আম আদমি পার্টির ক্ষেত্রে। আগামী বছর পাঞ্জাবে ভোট। তার আগে এই রাজ্যের নির্বাচিত আপ এমপি-বিধায়কদের প্রায় সাফ করে দেওয়ার রোডম্যাপ যেন তৈরিই করে ফেলেছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব। সুতরাং দেশজুড়ে আঞ্চলিক দলগুলির সংকট একটাই, দল রক্ষা করা। আর বিজেপিরও লক্ষ্য একটাই—বিরোধী মুক্ত ভারত।